বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২২ পূর্বাহ্ন
অনুসন্ধান ২৪ >>বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সংকটের দিকে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে কমিশন। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য থাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই প্রায় ৪০ হাজার মেশিন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। অবশিষ্ট এক লাখ ১০ হাজার মেশিনের অধিকাংশে ধরা পড়ে নানা ত্রুটি। মেরামতের জন্য তহবিলের অভাব ছিল, যার ফলে ইভিএমের কার্যকারিতা সংকটে পড়েছে। ফলস্বরূপ, হাজার হাজার কোটি টাকার মেশিন অচল হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের ভোট ব্যবস্থায় ইভিএমের ভবিষ্যৎ কী? রাজনৈতিক ঐক্য ও কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবের কারণে ইভিএমের ব্যবহার এবং সংরক্ষণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এমনকি হাজার হাজার কোটি টাকার ইভিএম মেশিনগুলোর অচল হয়ে যাওয়ার শঙ্কা ঘিরে রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন সরকারের সহযোগিতার মাধ্যমে ইভিএম সংরক্ষণের পরিকল্পনা করতে যাচ্ছে, তবে তার সফলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক ঐক্য এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার ওপর।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশে ভোটযন্ত্রের উন্নত ব্যবহারের জন্য নেয়া হয়েছিল একটি বিশাল প্রকল্প, যার মাধ্যমে প্রায় তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকার ইভিএম কেনা হয়েছিল। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকার কারণে বর্তমানে হাজার হাজার কোটি টাকার মেশিন কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে।
প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বর্তমান সমস্যার সমাধান খুঁজতে হচ্ছে ইসি কর্মকর্তাদের। সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য সরকার থেকে পর্যাপ্ত তহবিলও পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ইভিএমের জন্য সাড়ে ১২০০ কোটি টাকার প্রস্তাবও সরকারের কাছে নাকচ হয়ে গেছে। এর ফলে প্রকল্পটি থেকে ‘এক্সিট প্ল্যান’ করছে নির্বাচন কমিশন।
ইসি কর্মকর্তারা বলেন, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং দলের মধ্যে অনৈক্য থাকায় জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এসব মেশিন বাতিল করাও সম্ভব নয়, কারণ এর মূল্য অনেক। তাই স্থানীয় নির্বাচনে চাহিদার ভিত্তিতে ইভিএম ব্যবহার করার পরিকল্পনা করা হতে পারে। এ মুহূর্তে এসব মেশিনের রক্ষণাবেক্ষণই প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইভিএম প্রকল্পের পরিচালক কর্নেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান গণমাধ্যমকে জানান, বর্তমানে এক লাখ ১০ হাজার মেশিন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেছে এবং মাত্র ৪০ হাজার মেশিন নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। প্রকল্পে দক্ষ কারিগরি লোকবল ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব ছিল, যার কারণে আজ এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তবে ইসি কর্তৃপক্ষ মেশিনগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে ওয়্যারহাউজ নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে এবং ইভিএম সংরক্ষণে আরো কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। এর জন্য নির্বাচনী এলাকার ভিত্তিতে খসড়া ডিজাইন প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে বলেন, ইভিএম অনেক ঝামেলার। আমরা এই ঝামেলায় যেতে চাই না। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যালট পেপারের মাধ্যমে করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ইভিএম ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্বল যন্ত্র ছিল, যা এখন অকেজো হয়ে গেছে। রাজনৈতিক ঐক্য ও আস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে এসব যন্ত্রের ব্যবহার সম্ভব নয়।
ইভিএম ব্যবহারের ইতিহাসে দেখা যায়, প্রথম দিকে সস্তা মেশিনগুলোর বিকল্প তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে উন্নতমানের মেশিন কেনার পরও তাদের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা যথাযথভাবে গড়ে ওঠেনি। ২০১৭ সালে বর্তমান কমিশন উন্নত মানের মেশিন কেনার জন্য ব্যয় বরাদ্দ করেছিল, তবে রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা এখন নতুন করে সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজছেন। তবে, প্রকল্পের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে সরকারের আর্থিক সহায়তার ওপর।