বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৪ পূর্বাহ্ন
নিয়াজ মো. >> ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার একটি ইউনিয়নের নাম ভৈরবপাশা। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে এখানকার ইউনিয়ন পরিষদে লাখ টাকায় বিক্রি করা হতো জাল ও ভূয়া ওয়ারিশ সনদপত্র। এইসব সনদপত্র মোটা অংকের বিনিময়ে কিনে নিতো জালিয়াতি চক্র। আবার চেয়ারমম্যান নিজেই একটি ভূমিদস্যু চক্রের নেতৃত্ব দেন। সেই চক্রটি জাল সনদ বানিয়ে বিভিন্ন জমি হজমের কাজে লিপ্ত হতেন। প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসে জালিয়াতি চক্রের শেকড়।
অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্র থেকে জানা যায়, ভৈরবপাশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান,দুজন মেম্বর,সাবেক সচিব ও বর্তমান সচিব মিলে সরকারি,বেসরকারি জমি আত্মসাৎ এর জন্য যারা ভূয়া কাগজপত্র তৈরি করে,তাদের চাহিদামত ওয়ারিশ সার্টিফিকেট দেয় চক্রটি।এসব ওয়ারিশ সার্টিফিকেট নিতে জমা করতে হয়না সরকারি ফান্ডে টাকা,করতে হয়না আবেদনও।বরং জানাজানি হওয়ার আগেই সরকারি ফাইলসহ নথি গুম করে চক্রটি।
এ সংক্রান্ত বিষয়ে লিখিত অভিযোগও দেয়া হয়েছে নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসকের কাছে। এই প্রতিবেদকের হাতে আসা নথিপত্র ও অভিযোগে উল্লেখিত তথ্যের অনুসন্ধানে যানা গেলো পরিষদের সচিব, মেম্বার এবং গ্রাম পুলিশ নিয়ে জোট করে ইউপি চেয়ারম্যান একেএম আব্দুল হক পরিকল্পিতভাবে জাল ওয়ারিশ সনদ সরবরাহ করতেন।
নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে দেয়া অভিযোগপত্র এবং ভুক্তভুগিদের দেয়া তথ্য সুত্রে জানাগেছে, ভৈরবপাশার ইউপি চেয়ারম্যান একেএম আব্দুল হক, ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন ও ফজলুল হক, সাবেক ইউপি সচিব বশির আহম্মেদ, বর্তমান সচিব জাকির হোসেন, গ্রাম পুলিশ আয়নাল হক জোটবদ্ধহয়ে পরিকল্পিতভাবে একাধিক জাল, ভূয়া ওয়ারিশ সনদ তৈরি করে তা অর্থের বিনিময়ে সরবরাহ করছেন বেশ ক’বছর ধরে। গনমাধ্যমে নাম প্রকাশ না করামর শর্তে স্থানীয় অনেকেই জানিয়েছেন ‘চেয়ারম্যান ও মেম্বারদ্বয় বিগত সরকারের আমলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়ায় তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই জাল ওয়ারিশ সার্টিফিকেট বিক্রি করতেন। ইতিপূর্বে তারা এরকম বহু জাল সার্টিফিকেট তৈরি করেছেন যা তদন্তে প্রমাণ মিলবে।’
চলতি বছর আদালতে এই চক্রের জাল করা কথিত ওয়ারিশ সম্পর্কিত একটি মামলার তথ্যের ভিত্তিতে যানা গেছে প্রতাপ নামক স্থানে প্রায় দেড় একর জমি আত্মসাৎ করেছে এই চক্রটি। মামলার নথিপত্র দেখে সন্দেহ হওয়ার পরেই খোঁজখবর নেওয়া শুরু করে এ প্রতিবেদক। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদে নথিপত্র ও রেজিস্ট্রার খোঁজ করে এবং বর্তমান সচিব কে সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশ সার্টিফিকেট সংগ্রহের জন্য ওয়ারিশদের আবেদন, রেজিস্ট্রার ও সংযুক্ত কাগজপত্র দেখাতে ও তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী তথ্য সরবরাহ করতে বললে তিনি এড়িয়ে যায়। ওয়ারিশ সার্টিফিকেটের কোন কপি, নথি, রেজিস্ট্রার, আবেদনের ফটোকপি, কোন ধরণের সংযুক্ত ছবি, মৃত্যু সার্টিফিকেট অথবা কোন এনআইডির কপি ইউনিয়ন পরিষদে নেই।
এসব কপি কেনো পরিষদে নেই এর কারন জানিয়ে ইউপি সচিব জাকির হোসেন বলেন, ‘আমি এখানে যোগদানের পর আমাকে চার্জ বুঝিয়ে দেওয়ার সময় সাবেক সচিব বশির আজম্মেদ আমার কাছে কিছুই জমাদিয়ে যায়নি। রেজিস্ট্রার নথিপত্র যদি থাকতো তাহলেতো তিনি তা জমা দিয়েই যেতো। তাই আমার দপ্তরে পুর্বের ইস্যুকৃত ওয়ারিশ সনদের কোনো নথি নেই।’ এমন ঘটনায় সংবাদ প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী একটি আবেদন করা হয়। আবেদনের খবর পেয়ে ভৈরবপাশা ইউনিয়নের বর্তমান সচিব জাকির হোসেন ও সাবেক সচিব বশির আহমেদ দুইজনই এ প্রতিবেদককে জানায়, ‘এসব সার্টিফিকেট চেয়ারম্যান এর নেতৃত্বে সাবেক সরকারের আমলে রাতের আধারে দেওয়া হত। কোন ধরণের যাচাইবাছাই, আবেদন গ্রহন, তদন্ত, রেজিস্ট্রার ছাড়াই অবৈধভাবে দুর্নীতি করে এসব যাকে তাকে দিয়ে দেয়াই ছিল তার কাজ।’ এই ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক এবং বর্তমান সচিব দুজনেই গনমাধ্যমের কাছে দুষছেন চেয়ারম্যানকে। আর চেয়ারম্যান নিজেকে নির্দোষ দাবি করে পাল্টা দুষছেন সচিব, মেম্বার এবং গ্রাম পুলিশকে।
অভিযুক্ত চেয়ারম্যান একেএম আব্দুল হক মুঠোফোনে প্রতিবেদককে বলেন, ‘সাবেক সচিব বশির আহম্মেদ এসব দুর্নীতির হোতা।আমি তো সবসময় অফিসে থাকতাম না। সে কি ফরম বিতরণ করলো, কি জমা রাখলো তা আমাকে কোনদিন খোলাসা ভাবে দেখায়নি।’ চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘পরিষদে ওয়রিশ সনদ তৈরি করে তা তদন্ত পূর্বক বিতরণ করা হত। আর ঐ তদন্তের দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্ট মেম্বর এবং গ্রাম পুলিশের। তারা সচিবকে নিয়ে ঘুষের বিনিময়ে জাল কিছু কাজ করেছেন। আমি তাদের বাঁধা দিলেও সচিব বশির আহম্মেদ আমার বাঁধা শুনতেন না।’
এই ইউনিয়ন পরিষদের এ ধরনের জালিয়াতি ঘটনায় ২০২৩ সালের ১৫ অক্টোবর ঝালকাঠির জেলা প্রশাসকের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন স্থানীয় আবুল কাসেম নামের একজন ভুক্তভোগী। বছর ঘুড়লেও সেই অভিযোগের হয়নি কোন তদন্ত। এ নিয়ে ভুক্তভোগীদের মনে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ। সদন জালিয়াতির কারনে ক্ষতিগ্রস্থ আব্দুল বারেক হাওলাদার জানান তার নিজের দুর্ভোগের কথা। তবে তিনি এ ঘটনায় একটি মামলার প্রস্তুতি নিয়েছেন বলেও জানায়।