শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৭ অপরাহ্ন
অনুসন্ধান ২৪ >> পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার আব্দুর রশিদ সরদার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে চাকরি করছেন উপজেলার সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক মো. খাইরুল আলম। অথচ গত বছর ২৬ ডিসেম্বর তার নিয়োগ বাতিলের নির্দেশ দেয় মাউশি। সেদিনই মাধ্যমিক উইংয়ের সহকারী পরিচালক কাওছার আহমেদ স্বাক্ষরিত এই সংক্রান্ড চিঠি বিদ্যালয়ের সভাপতিকে প্রেরণ করা হয়। এরআগে ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর তাকে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো। এর চারদিন পরে এ নিয়োগ বাতিলের জন্য মাউশির মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করেন ৮ জন নিয়োগ প্রার্থী। আবেদনে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুস বাণিজ্যের মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। যার প্রেক্ষিতে দুই দফা তদন্ত করে মহাপরিচালকের কাছে প্রতিবেদন পাঠান মাউশির বরিশাল অঞ্চলের উপ-পরিচালক। তদন্ত রিপোর্টে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়নি বলে জানানো হয়েছিলো।
প্রধান শিক্ষক খাইরুল আলমের নিয়োগ বাতিল সংক্রান্ত মাউশির ওই চিঠি উপেক্ষা করেন সভাপতি। এই সুযোগে হাইকোর্টে মাউশির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট করেন ওই প্রধান শিক্ষক। চলতি বছর ১৫ জানুয়ারি রিটের শুনানি শেষে মাউশির নির্দেশ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে হাইকোর্ট। হাইকোর্টের এই আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন মাউশির মহাপরিচালক। পরে ২০ মার্চ হাইকোর্টের আদেশ আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন চেম্বার আদালত। এসময়ের মধ্যে এই আদেশের মেয়াদ বৃদ্ধি ও আপিল নিষ্পত্তির আবেদন করেন মাউশির মহাপরিচালক। আবেদনটি আলিপ বিভাগের শুনানির অপেক্ষার তালিকায় আছে।
এছাড়াও সরেজমিন তদন্তে ৮জন নিয়োগ পার্থীর অভিযোগে বর্নিত অনিয়ম ও নিয়োগ বোর্ডের ত্রুটিপূর্ণ কর্মকান্ডের কারণে নিয়োগ কার্যক্রম বিতর্কিত হয়েছে বলে প্রতীয়মাণ হয় মর্মে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সাথে নিয়োগ কার্যক্রম শতভাগ স্বচ্ছ হয়নি। এই ক্ষেত্রে জেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারগণ এবং নিয়োগ কর্মকর্তা ও পটুয়াখালী জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের গাফিলতি ও ত্রুটির বিষয়টিও উঠে আসে ওই তদন্ত প্রতিবেদনে। অন্যদিকে, নিয়োগের তিনবছরে সরকারি বেতন চালু হয়নি খাইরুল আলমের। মামলা জটিলতা কাটাতে পারেনি তাই তার ইনডেক্স জটিলতা কাটাতে পারছে না। প্রধান শিক্ষক পদের এই বেতন তিনি বিদ্যালয়ের টাকা থেকে গ্রহণ করেছেন।
অন্যদিকে আপিল বিভাগের সর্বশেষ অফিস আদেশ অনুযায়ী কোর্টের পূর্বের আদেশের মেয়াদকাল বেড়ে শুনানির তারিখ পর্যন্ত বলবত বলে গণ্য হয়। আদেশানুরুপ নিয়োগ বাতিলের নির্দেশসহ মাউশি প্রেরিত চিঠি এখন কার্যকর আছে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। এদিকে নিয়োগের বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের একজন ওই বিদ্যালয়েরই সহকারী প্রধান শিক্ষক সেলিম রাজা। এ অপরাধে তার বিদ্যালয় প্রদত্ত ভাতা বন্ধ করাসহ তার রুমের চাবি আটকে রাখার অভিযোগ আছে এই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
মাশি বরিশাল অঞ্চলের মহাপরিচালকের প্রতিবেদনে বলা হয়- ২০২১ সালে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ কমিটি গঠিত হলে কমিটির বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন একজন অভিভাবক সদস্য। ১৩ ডিসেম্বর সেই রিটের শুনানিতে হাইকোর্ট তার অভিযোগ নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন, যা উপেক্ষা করে ১৫ ডিসেম্বর নিয়োগ সম্পন্ন করে নিয়োগ কমিটি। সেদিন সকালে ২৭ জন নিয়োগ প্রার্থী পরীক্ষা কেন্দ্রে যায়। হাইকোর্টের আদেশে পরীক্ষা হবে না বলে তাদের জানান নিয়োগ কমিটির সদস্য ও পটুয়াখালী জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ততকালীন প্রধান শিক্ষক। কিন্তু সেদিনই গোপনে মাত্র ৫ জনের পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে এবং সন্ধ্যার মধ্যে তড়িঘড়ি করে খাইরুল আলমকে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। সাক্ষ্য ও নথিপত্রে এর প্রমাণ মেলে। বিষয়গুলো সাধারণ দৃষ্টিতেও অনিয়মের সংকেত দেয়।
সকল অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে বৈধ প্রধান শিক্ষক বলে দাবি করেন মো. খাইরুল আলম। তিনি বলেন, ষড়যন্ত্র করে আমার নিয়োগ বাতিলের চেষ্টা করা হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের শুনানির পরে নিয়োগের বিষয় চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। আমি কখনো ঘুস লেনদেন করিনি এবং করবোও না। দলীয় পদ এই নিয়োগে সহযোগিতা করেছে কিনা প্রশ্নের জবাবে, আওয়ামী লীগের কোনো পদে নেই বলেও দাবি করেন প্রধান শিক্ষক খায়রুল আলম।
এদিকে মুঠোফোনে বাউফল সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, কামরুজ্জামান লিটন মোল্লা নিশ্চিত করেন, প্রধান শিক্ষক মি. খাইরুল তার রানিং কমিটির শিক্ষা ও মানবসম্পদ সম্পাদক।
অভিযোগের বিষয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি পটুয়াখালীর শিক্ষা কর্মকর্তা মুহা: মুজিবুর রহমান। তবে মাউশির নির্দেশ বাস্তবায়ন করার বিষয় প্রশ্নের জবাবে, কোর্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাদের কিছু করনীয় নেই বলেন তিনি।
এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ চলমান। আইন শাখার মতামত ছাড়া এর বাইরে কিছু বলা সম্ভব না বলে জানান মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সহকারী পরিচালক কাওছার আহমেদ। তিনিই গতবছর নিয়োগ বাতিলের সেই চিঠি সাক্ষর করেছিলেন।
মাউশির আইন শাখার শিক্ষা অফিসার মো. আল আমিন সরকার বলেন, ‘সুপ্রীম কোর্টের আদেশ ও আইনানুসারে, প্রধান শিক্ষক খাইরুল আলমের নিয়োগ যথাযথ না হওয়ায় নিয়োগ বাতিলের জন্য মাউশির চিঠির কার্যক্রম চলমান আছে। ইউএনও যদি কোর্টের কাগজ বুঝতে না পারে তাহলে তার উচিত এ বিষয়ে মাউশির কাছে জানতে চাওয়া। মাউশি অবশ্যই তাকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করবে।’অনৈতিক উপায়ে নিয়োগ প্রাপ্তি ও অবৈধ দায়িত্ব পালনের জন্য মো. খাইরুল আলমের বিরুদ্ধে মাউশির ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইন শাখার এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মাউশির জুডিশিয়ারির ক্ষমতা যা আছে যেমন- তার দায়িত্ব পালনের সময় বিদ্যালয়ের খরচে যে সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন, উন্নয়ন কাজে যে অর্থ ব্যয় করেছে তা ফেরত দিতে অপরগতা প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলা করতে পারে।’
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের সভাপতি ও ইউএনও মো. বশির গাজী বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে ম্যানেজিং কমিটির সভা ডেকে এ বিষয়ে কাগজ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
আরো পড়ুন