বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৮ অপরাহ্ন
অনুসন্ধান২৪>>রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহীপুর এলাকায় অবস্থিত তিস্তা সেতুর পাশে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আবারও উঁকি দিচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা। অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে নীলফামারীতে চীনের সহায়তায় এক হাজার শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত এ সম্ভাবনাকে আরো জোরালো করেছে।
তিস্তাপাড়ের মানুষের বিশ্বাস, এ হাসপাতাল নির্মিত হতে পারে বৃহত্তর তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রথম ইতিবাচক বার্তা।
একসময় উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত ছিল তিস্তা।
কিন্তু ১৯৯৮ সালে ভারতের গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণের পর নদীর প্রবাহ কমে আসে আশঙ্কাজনকভাবে। আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে পানি আটকে রাখায় তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার প্রভাব পড়ে দেশের পাঁচ জেলা নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার মানুষের জীবনে। পানি সংকট, কৃষি বিপর্যয়,নদীভাঙন আর পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির কারণে এই জনপদ হয়ে পড়ে চরম দুর্দশাগ্রস্ত।
বাংলাদেশ-ভারতের তিস্তা পানি বণ্টন নিয়ে ইতিহাসও কম জটিল নয়।
১৯৮৩ সালে শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশের জন্য ৩৬ শতাংশ আর ভারতের জন্য ৩৯ শতাংশ পানি বরাদ্দের যে চুক্তি হয়েছিল, তা রয়ে গেছে কাগজেই। পরে ২০১১ সালে দুই দেশের মধ্যে সমান পানিবণ্টনের খসড়া প্রস্তুত হলেও পরে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এর পরও তিস্তা পরিকল্পনার স্বপ্ন দেখিয়ে নির্বাচন এসেছে, নির্বাচন গেছে; বাস্তবে কিছুই অর্জিত হয়নি বলে মনে করে তিস্তাপারের মানুষ।
রিজিওনাল জাস্টিস অ্যান্ড রাইটস (রিজু) ফেলো মো. আব্দুল্লাহ-আল-মাহবুব বলেন, ‘আমাদের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে পারলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন আসবে।
’
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মাহবুব মনে করেন, তিস্তার বিপর্যয় মূলত মানুষেরই সৃষ্টি। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির সঙ্গে যোগ হয়েছে তিস্তায় আর্টিফিশিয়াল (মানুষের দ্বারা) ক্ষতি। ভারত অভিন্ন নদীর পানি আটকে রাখছে। ফলে এ অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য ভয়াবহভাবে নষ্ট হচ্ছে।’
২০২১ সালে চীন তিস্তা মহাপরিকল্পনার নকশা প্রণয়ন করে এবং ২০২৩ সালে কাজ শুরুর প্রাথমিক প্রস্তুতিও নেয়।
কিন্তু ভারতের আপত্তির মুখে তা সামনে এগোয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে তৎকালীন সরকারও প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগ্রহী হয়নি। ফলে দুই কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন থেকে যায় অধরাই।
কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। চীনের সহায়তায় নীলফামারী সদর উপজেলার দারোয়ানী টেক্সটাইল এলাকায় ২৫ একর জমিতে এক হাজার শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের প্রক্রিয়া তিস্তাপারে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ত্বহা হুসাইন বলেন, ‘চীন যদি ভবিষ্যতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চায়, এই হাসপাতাল প্রকল্প তাদের জন্য ইতিবাচক একটি ইঙ্গিত।’
শিক্ষক ও উন্নয়ন গবেষক উমর ফারুক মনে করেন, ‘হাসপাতাল প্রকল্পটি ভারতের প্রতিক্রিয়া বুঝতে একটি পরীক্ষামূলক পদক্ষেপও হতে পারে। তিস্তা প্রকল্প শুরুর আগে চীন কতটা সফলভাবে এ অঞ্চলে কাজ করতে পারে-এ হাসপাতাল নির্মাণ তারই বার্তা বহন করছে।’
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিস্তায় ন্যায্য পানির হিস্যা ও মহাপরিকল্পনার দাবিতে নদীর বাংলাদেশ অংশজুড়ে ১১৫ কিলোমিটার এলাকায় নানা কর্মসূচি পালন করেছে তিস্তাপারের মানুষ। তাদের দাবি, আগামী ডিসেম্বরেই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সূচনা হোক, দীর্ঘ শুষ্কতার অবসান ঘটুক উত্তরের জনপদে।
তিস্তাপারের সাধারণ মানুষের একটাই প্রত্যাশা-বাঁধে নয়, বরং তাদের জীবনে আবারও বইতে শুরু করুক তিস্তার জীবনধারা।
তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান বলেন, ‘আমরা চাই ডিসেম্বরের মধ্যেই মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হোক। এটি চীনের প্রকল্প নয়, ভারতেরও নয়-এটি বাংলাদেশের নিজস্ব প্রকল্প।’