শনিবার, ২৫ Jul ২০২৬, ০৯:৪৬ অপরাহ্ন
জীবনানন্দ দাশ বলেন, ‘জীবন এক সুন্দর মিথ্যা আর মৃত্যু একটা নির্মম সত্য’। সাম্প্রতিক লকডাউনের বদৌলতে জীবনযাপনে এই উপলব্ধি সকলের নিউরণে অনুরণন ঘটাচ্ছে। মানুষের চিন্তায় একই সময়ে দুটি সত্তা বিরাজ করে- একটি জীবিত থাকার নিরন্তর প্রয়াস অন্যটি মৃত্যুর প্রস্তুতির ও স্বাদ গ্রহণের চিন্তা।
জীবিত সত্তাকে সুখের ভৈরবী সুরে হাওয়ায় ভাসানোর জন্য নানা পেশা, নানা নেশা, যত রকমের কাজ কাম আছে মানুষ সব করতে চায়। কিন্তু এই চাওয়ার মধ্যে একটা পরিমিত বোধ থাকা চাই। এই জায়গাটাতে পৃথিবীর মানুষ আর স্থির নেই। যার ফলে, মাঝে মাঝে প্রকৃতি নিজের তাগিদে সাড়া দেয়; আর তখন মানুষের সেই বাকি সত্তা- একদিন মরতে হবে বিষয়টি সামনে আসে। দার্শনিক আলোচনার বাইরে যত ধর্মীয় মত ও পথ আছে সেখানেও বলা আছে- মৃত্যু প্রত্যেকটি মানুষের গলার মায়াবী হারের খুব কাছে এমন সন্নিকটে থাকে।
শূন্য থেকে বিশাল এই ব্রহ্মা- তারপর পৃথিবী। এখানে একটি আত্মার দেহের অবয়ব লাভ আবার আত্মার চলে যাওয়ায় দেহ শূন্যে মিশে যায়। আত্মার দেহে আসা ও দেহত্যাগ মাঝখানে মানুষের দেহের সজীব চলাচল- জন্মের পর পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক এমন ক্ষেত্রে অনেক দায়িত্ব ও উদযাপনের বিষয় থাকে।
এই ক্ষেত্রগুলোতে মানুষ আজ শুধু বেঁচে থাকার জন্য চরম অসুস্থ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ। এমন জীবনের মধ্যেখানে যে একটু একটু পজ দিয়ে মৃত্যুর প্রস্তুতির জন্য ন্যায়ত জীবনাচার থাকা দরকার তা বেমালুম ভুলে যাই। মহাবীর আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তার শবযাত্রার যে শূন্য হাতের প্রতীকী মেসেজ বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য দিয়েছেন তাও ছিল এমন।
শরীরের রক্তকণিকার বিদ্যুৎ প্রবাহ যখন সর্বোচ্চ পরিমাণে তরঙ্গায়িত তখন মানুষ বেঁচে থাকার মোহে মৃত্যুকে সচেতনভাবে ঘরের চৌকাঠের বাইরে রাখতে চায়। কিন্তু বয়সের সঙ্গে রক্তের ইলেকট্রন প্রবাহ যখন দিন দিন কমতে শুরু করে তখন শত শক্তিশালী দরজার খিড়কি ভেজিয়ে দিলেও মৃত্যুর চিন্তাকে আর আটকানো যায় না।
এই দুই সত্তার আনাগোনা চিরায়ত ও চিরন্তন। যা লালনের গানেও বলেছেন- ‘আমার এই ঘরখানায় কে বিরাজ করে?’ এমন সময় যদি আসে জীবিত থাকার জন্য সব ধরনের ভালোবাসার মানুষ, উপাদান-উপকরণ, জোগাড় যত আছে কিন্তু আপনি করোনা সংক্রমণের ভয়ে! তখন কি আপনার সীমাহীন প্রতিযোগিতায় লেগে দৌড়ানোর অসম জীবন যাপনকে দূষবেন না? মনে মনে অবশ্যই দূষবেন।
করোনা সংক্রমণের ভয়ে থাকছেন- এই বুঝি বাজার ঘুরে জুতার সঙ্গে কোভিড-১৯ এর ড্রপলেট এল, চেইন শপে স্বাদের বাজার নিয়ে ফিরছেন সঙ্গে ভাইরাস এমন প্লাস্টিকের ব্যাগেও তিনদিন স্থায়ী হয়! এ ধরনের ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র মৃত্যুদূতের স্পর্শ ও সংস্পর্শে আসার ভয়ে প্রতিদিন যখন প্রতিটি সেকেন্ড আপনাকে গণিতের পৌনঃপুনিক হিসাবে সূক্ষ বাছবিচার করে চলতে হচ্ছে এমতাবস্থায় একজন সুস্থ-সুন্দর শরীরের রক্তের ইলেকট্রন প্রবাহ নিমিষেই নিচের দিকে আসার কথা। আসছেও। এ ধরনের অবস্থায় মৃত্যুর চিন্তা ঢংঢং করে মস্তিকে ঘণ্টা বাজায়। কিন্তু তখন আমাদের কিছুই করার থাকে না।
ধরা যাক, একজন অতি দক্ষ চালক যাত্রীবাহী গাড়ি নিয়ে মসৃণ রাস্তায় বিরতিহীন ছুটছে। সঙ্গে কিন্তু একজন দক্ষ সহকারী থাকে বা রাখে। চালকের দীর্ঘ স্টিয়ারিং ধরে থাকা ও এক দৃষ্টিতে তাকানোর ফলে চোখের এক ধরনের দৃষ্টিভ্রম হতে পারে বা অনেক সময় হয় তখন সহকারীটি দরজায় জোড়ে থাপ্পড় কষে বলে- ওস্তাদ, বামে প্লাস্টিক! ডানে কাটেন। এই মহামারির কবলে গোটা বিশ্ব সম্প্রদায় আজ থমকে গেছে।
পরিমিত জীবনাচার যেমন ব্যক্তি পর্যায়ে নেই তেমনি রাজনৈতিক (দেশ) ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উন্নয়নের নামে কড়া অর্থনৈতিক সূচকের লাগামহীন ছুটে চলার কারণে প্রকৃতি সেই চালকের সহকারীর মতো করোনাভাইরাস হয়ে একটি চপেটাঘাত করেছে। ব্যক্তি তো একটি জাতির নেতা আবার কতগুলি ব্যক্তি মিলে বিশ্বের নেতৃবৃন্দ হয়। সীমাহীন ভোগবাদী নেতৃবৃন্দের দর্শনে মানব উন্নয়ন সূচক হয়- প্রকৃতিকে নির্বিচারে শোষণ করে যত রকমের মানুষ মারার প্রতিযোগিতা আছে সেগুলিকে স্টান্ডার্ড করা।
বিশ্ব নামক এই যানের গোটাকতক চালকের অসুস্থ অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ফলে যাত্রী হিসেবে কত দেশের মানুষ মৃত্যুর দিন গোনার নিঃশ্বস ফেলছে। একে কোন সূচকে পরিমাপ করা যায়? এমন অসম প্রকৃতি বিধ্বংসী সভ্যতার সঙ্গে প্রকৃতি একটি বিরূপ সাড়া দিয়েছে। করোনার সঙ্গে মানুষের কলুশন হচ্ছে। সারা বিম্বে ইতোমধ্যে লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারাল; এটি কার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। গৌতম বুদ্ধ বলেন- ‘পেইন ইজ দ্য আউট কাম অব সিন’। এ অনিয়ন্ত্রিত বিশ^ব্যবস্থার পরিবেশ প্রতিবেশের ওপর জুলুমের পাপ!
প্রচলিত আদিম প্রবাদ আছে- ‘উচ্চ শিক্ষিত বা পন্ডিত হতে হলে সুদূর চীন দেশে যাও’। চীন প্রাচীন সভ্যতার দেশ। সেখান থেকে জীবননাশকারী এমন একটি ভাইরাস মানবকুলকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে তা কি সেই সূচক নির্ধারণী হর্তাকর্তারা আঁচ করতে পেরেছিল? এই জ্ঞান বিতরণকারী সভ্যতা তাহলে আর পরিবেশ প্রেমী ন্যায়শীল আদর্শে নেই বোঝা যায়। করোনা- ‘প্রকৃতির থাপ্পড়’ বুঝিয়ে দিচ্ছে নিজের মনগড়া গাড়ী (উন্নয়ন) চালনা করলে হবে না। এটি সাধারণ কোন দূর্যোগ সংকেত নয়; সোজা শত শত প্রাণ কেড়ে নিয়ে বলছে- এই বিশ্ব পরিবেশ প্রকৃতি নিয়ে তোমরা অনেক খেলছো, এখন প্রকৃতি তোমাদের নিয়ে খেলবে।
ইতিহাসে এমন অনেক সভ্যতা প্রকৃতির সাজুয্য না মেনে ধ্বংস হয়েছে। সিন্ধু, চৈনিক, পেরু এমন অনেক সভ্যতা বিলীন। সভ্যতা ধ্বংস হয়েই পরিবেশ প্রতিবেশের লাইন অব কন্ট্রোল না মানার কারণে। প্রতিবেশ নৃবিজ্ঞানে বলা হয়- যে সভ্যতা যত বেশি প্রকৃতিকে শোষণ করেছে; প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে শক্তি আহরণ করেছে সেই সভ্যতা তত উন্নত হয়েছে। আবার শক্তির যথেচ্ছা ব্যবহারের কারণে ধ্বংস হয়েছে।
প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে সম্পদ শোষণ করে মানুষ শক্তির রূপান্তর ঘটিয়ে আকাশ দখল, সমুদ্র দখল, পানি দখল, মাটি দখলের মতো শক্তি প্রদর্শনীর খেলায় উদ্যাম নৃত্য করছি। আকাশে যুদ্ধাস্ত্র, মঙ্গলে নভোযান নিক্ষেপের প্লান্ট, পারমাণবিক কেন্দ্র, বায়ুম-লে স্যাটেলাইট জট, সমুদ্রের তলদেশ প্লাস্টিক বর্জ্য, মাটির নিচের গ্যাস, তেলের সীমাহীন লড়াই, আকাশ ছোঁয়ার জন্য বহুতল ভবন, তেজস্ক্রিয় বেতার প্রযুক্তির লাগামহীন ব্যবহারসহ সব ব্যবহার্য দ্রব্যসামগ্রীর প্লাস্টিকায়ন এবং পানি নিয়ে ব্যবসা। এমন হেন পৈশাচিক হামলা প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে করে যাচ্ছি। প্রকৃতি কি ছেড়ে দিয়ে কথা বলবে? বলেনি।
প্রকৃতির বুক চিরে আহরিত সম্পদ ও শক্তির খালি জায়গাগুলো কী করবে? তার উপাদানের ঘাটতি তো সইবে না। এই শূন্য জায়গা থেকে বিরূপ সাড়া দিচ্ছে। যুক্তি শুধু মানবসৃষ্ট বিজ্ঞান আর গণিতে নেই প্রকৃতির সহজ সরল যুক্তি আছে। জনপ্রিয় একটি লোকগানের উল্টো অর্থ ধরলে প্রকৃতির স্বভাবটা বোঝা যায়- ‘তুমি হও গহীন গাঙ আমি জলে ডুইব্যা মরি’।
আর কত! বর্তমান সময়ে করোনাই একটি সবচেয়ে বড় শক ও সতর্কবার্তা। এর আক্রমণ থেকে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের একজন কোয়ারান্টিনে। করোনার থাবায় এখন আমির ওমরাহ থেকে চামার চ-াল সবাই! লালনের গানের মতো করোনা জাত, পাত, ধনী দেশ, দরিদ্র দেশ কিছুই মানছে না- চামার চ-াল মুচি এক জলে হয় সবার শুচি তেমনি করোনার ভয়ে আজকে সবাই যুঝি! প্রকৃতির লাইন অব কন্ট্রোলের নিয়মে আমরা কেউই নেই। না আহারে, না বিহারে-ব্যাসনে, দেশে-দেশে নেই, সম্পদ আহরণে নেই, ব্যবহারে তো নেই। ব্যক্তির সূক্ষ্ম দাম্পত্য জীবন থেকে বৃহৎ বহুপাক্ষিক সম্পর্ক ও চুক্তিতে আজ শোভনীয় নিয়ন্ত্রণ নেই। একজন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করছি আরেকজন আরব সাগর রণতরী পাঠিয়ে দখল করছি; একজন আফগানিস্তান তো অন্যজন ইয়েমেন।
এমন করে কেউ সিরিয়া কেউ লেবানন; আবার একজন আরাকান দখল করছি তো আরেকজন তিব্বত, কাশ্মীর নিয়ে ব্যস্ত হচ্ছি। একজন ইসরাইল নিয়ে অন্যজন ফিলিস্তিন! ব্রাহ্মণ, শিখ, বুদ্ধ, যিশু, মোহাম্মদ সবাইকে যে যার মতো ভাগবাটোয়ারা করে নিয়ে খেলছি। কেউ কি আমরা লাইন অব কন্ট্রোলে আছি? নেই।
প্রকৃতি জুলুম ও শূন্যতা মোটেই পছন্দ করে না। করোনার ঠেলা সামলানো দায় হয়ে পড়ছে! এখন তাহলে উপায়? হও আলাদা সবাই। কোন মানুষ কারো মুখদর্শন করা দূরে থাক এখন এক বাড়িতে শত ঘর! সবাই সবার পর। খাঁটি বাংলায় একটা প্রবাদ আছে- ‘ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে’। একদম সামনে ঘোর অমানিশা! আবার লোক গানে বলতে হয় ‘আগের বাহাদুরি এখন গেল কই? চলিতে চরণ চলে না- দিনে দিনে অবশ হই।’
প্রতি দিনের প্রতিটা রাত বাংলাদেশের সুস্থ ও অসুস্থ মানুষ নিজ ঘরে স্ব-নির্বাসন জীবনযাপন করছে। এ যেন নিজ আলয়ে পরবাসী। দীর্ঘ ১ মাস থেকে কার্যত গৃহবন্দি সকলে। মানুষ মানুষের থেকে বিছিন্ন হবে পরস্পর তিন ফুট দূরে থাকবে এটা কি সাংঘাতিক বার্তা নয়? দার্শনিক দৃষ্টিতে এটি একটি চরম শাস্তি ও বোধ জাগানোর বার্তা। এটা একজন আরেকজনকে তাচ্ছিল্য করার শামিল। একজন আরেকজনকে বলছে- তোমার শৃঙ্খলাবিহীন বেঁচে থাকা, জীবনযাপনের অসম চাহিদা পূরণের জন্য আজকে আমার জীবন মৃত্যুর মুখে? সুতরাং তুমি দূরে থাকো। লেখক নাজিম হিকমত বলেন- ‘জীবন বড় সুন্দর, ব্রাদার!’
না, হিকমত ভাই। জীবন বড়ই দুর্বিসহ- ডানেও করোনা, বামেও তাই!