মঙ্গলবার, ২৮ Jul ২০২৬, ০৮:২২ অপরাহ্ন
অনলাইন ডেস্ক :: মহামারির প্রভাবে পুরো বিশ্ব আজ জর্জরিত। নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে সমগ্র বিশ্বের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ। উন্নতমানের সজ্জিত সমরাস্ত্র, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ও সামরিক শক্তি মানুষকে বাঁচাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
কোনোকিছুর বিনিময়েই যেন মিলছে না জীবনের নিরাপত্তা। চরম সঙ্কটের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে সমগ্র বিশ্ব। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
সময় যত গড়াচ্ছে ততই অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশটি। প্রথম ১০০ জন করোনা রোগী শনাক্ত হতে যেখানে সময় লেগেছিল পুরো ২৬ দিন সেখানে পরবর্তী একশ’জন রোগী শনাক্ত হতে সময় লাগছে ২৬ ঘণ্টারও কম। পরবর্তীকালে এই পরিস্থিতি যে আরও ভয়ানক হতে চলেছে তা স্পষ্ট।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নানা সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বাংলাদেশকে। আয়তনের তুলনায় ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশ। বর্ধিত এ জনসংখ্যার। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে অর্থনীতির ওপর।
স্বাধীনতা পরবর্তী দুর্ভিক্ষ, সেনা শাসন আবার গণতান্ত্রিক সরকার। দরিদ্র দেশ থেকে নানা চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করে ধীরে ধীরে উন্নয়নশীল অর্থনীতির তালিকায় নাম লিখিয়েছে দেশটি।
কোভিড-১৯ এর যেভাবে জ্যামিতিক হারে সংক্রমণ শুরু হয়েছে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ। একই সঙ্গে মৃত্যুহারের দিক দিয়ে চরমভাবে সংক্রমিত দেশ স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে গেছে দেশটি। এর প্রভাবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিবর্তন আসবে। আপাতত স্থিতিশীল রাজনীতির জন্য রাজনৈতিক পরিবর্তন খুব সামান্যই হবে। তবে পরিবর্তন সবচেয়ে ব্যাপক আকারে হতে চলেছে যে ক্ষেত্রে তাহলো অর্থনীতি।
তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে এমনিতে নড়বড়ে অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আছে এই দেশ। তার ওপর আবার আকস্মিক এই দুর্যোগ। সুতরাং অর্থনৈতিকভাবে এদেশ কতটা সংকটের সম্মুখীন হতে চলেছে তা আন্দাজ করাও দুঃসাধ্য।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাক শিল্প, রেমিট্যান্স ও কৃষি। এছাড়াও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠা শিল্প-কারখানাগুলোও যথেষ্ট অবদান রেখে চলেছে এই অর্থনীতিতে। এ সকল ক্ষেত্র থেকে অর্জিত রপ্তানি আয় জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সাহায্য করছে। কিন্তু করোনার প্রকোপে প্রতিটি ক্ষেত্রই আজ অচল প্রায়। মাত্র বিশ দিনের ব্যবধানে বহুগুণে নেমে এসেছে আয়ের মাত্রা। সংকটকালীন ও সংকট পরবর্তী সময়ে কোন পথে এগোবে দেশের অর্থনীতি তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে অর্থনীতিতে ব্যাপক ধস নামবে এটা বলা যায়।
এই ধস কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা স্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের প্রথম রপ্তানি শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। সে সময় থেকেই বাংলাদেশের পোশাক শিল্প উন্নতির পথে। তৈরি পোশাকের প্রচুর কদর রয়েছে বাইরের দেশগুলোতে। ফলে বিগত কয়েক দশক ধরে পোশাকশিল্প থেকে প্রচুর আয় করেছে দেশটি।
এশিয়ার দেশগুলো ছাড়াও ইউরোপ ও আমেরিকার নামি-দামি দেশগুলোতে তৈরি পোশাকের অন্যতম রপ্তানিকারক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে দুর্বল অর্থনীতির অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লেখাতে একধাপ এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। কিন্তু এই সংকটকালে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে গার্মেন্টসগুলো।
বিভিন্ন দেশের বায়ারদের নিকট থেকে প্রতিশ্রুতি নেওয়া পোশাক পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে মালিকরা। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের বায়ার তাদের অর্ডার বাতিল করেছে। বাংলাদেশ পোশাক শিল্পের কাঁচামালে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। ফলে আমদানি করতে হয় বাইরের দেশ থেকে।
২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী এই আমদানির শতকরা ৪০ ভাগ আসে চীন থেকে। কিন্তু চীন থেকে এই সংক্রমণ শুরু হওয়ায় নতুন বছরের প্রথম থেকেই বন্ধ রয়েছে আমদানি। কাঁচামাল সংকটে পড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে।
এছাড়াও তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার হলো ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডাতে। প্রায় ৮৫ ভাগ পোশাক বিক্রি হয় এ দেশগুলোতে। কিন্তু করোনা সংক্রমণের ‘হটস্পট’ এই দেশগুলো অচল প্রায়। ফলে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য। এতে করে অর্থনৈতিক ধস ত্বরান্বিত হবে এটা যে কেউ অনুমান করতে পারছেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম আরেকটি চালিকাশক্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স। করোনা সংকট যদি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হতো তবে সমস্ত আয়ের উৎস অচল হয়ে গেলেও অন্তত রেমিট্যান্সের দরজা খোলা থাকত। কিন্তু এটি ‘গ্লোবাল ইস্যু’তে পরিণত হওয়ায় প্রবাসীরাও কর্মহীন দিনাতিপাত করছে। ফলে দেশে পাঠাতে পারছে না কোনো অর্থ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্যমতে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ কোটির বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন। শুধু ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রবাসীরা ১৬৮ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশের জিডিপিতে ১০ শতাংশের বেশি অবদান রেখেছে এই রেমিট্যান্স। বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, কুয়েত, যুক্তরাজ্য, কাতার ও ইতালিসহ আরও অনেক দেশ। আর এই দেশগুলোই করোনা সংক্রমণের হটস্পটে রূপান্তরিত হয়েছে।
পুরোপুরি অবরুদ্ধ রয়েছে দেশগুলো। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশ প্রবাসীদের পাঠিয়ে দিচ্ছেন নিজ দেশে। বাংলাদেশেও কয়েক লক্ষ প্রবাসী ফিরে এসেছেন। এভাবে দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকায় রেমিট্যান্স নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়। ভেঙে পড়বে দেশের অর্থনীতি।
একইসঙ্গে থমকে দাঁড়িয়েছে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের উৎপাদন। ব্যাহত হচ্ছে পরিবহন সেবা। হ্রাস পাচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। অবরুদ্ধ থাকায় অন্যান্য শ্রেণি পেশার মানুষও বের হতে পারছে না কাজের সন্ধানে। লাখ লাখ বস্তিবাসী অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে শুধু রাজধানীতেই।
এ সকল দরিদ্র শ্রেণির খাদ্যের সরবরাহ করতে হচ্ছে সরকারি তহবিল থেকে। বাংলাদেশ সরকার করোনা মোকাবেলায় ইতোমধ্যে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছেন। যা এই দেশের জন্য অনেক বড় অ্যামাউন্ট।
কিন্তু করোনা কতদিন স্থায়ী হবে তা বলা কঠিন। ফলে পরবর্তী সময়ে আরও বেশি পরিমাণ আর্থিক সহায়তা দিতে হতে পারে সরকারকে। এতে করে সরকারি তহবিল শূন্য হয়ে পড়বে। এছাড়াও উৎপাদন ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত পরিবহন সুবিধার অভাবে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকা মূল্যের পচনশীল দ্রব্য। আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন মালিকরা। ফলে দেউলিয়া হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে অনেক কারখানার মালিকদের। ফলে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম হবে। বৃদ্ধি পাবে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ। সে কারণেই করোনা পরবর্তী সময়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
সর্বোপরি, সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে চলতি বছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ। বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের পূর্বে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় একটি রিপোর্ট পেশ করেন। এখানে বলা হয়েছিল, ‘বাংলাদেশের জিডিপি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে এক দশমিক এক ভাগ কমে যেতে পারে। পাশাপাশি মোট তিনশ’ কোটি ডলারের ক্ষতি হবে। চাকরি হারাবে প্রায় নয় লাখ ব্যক্তি।’
এই রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার সময়ও বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হয়নি। তবুও ক্ষতির পরিমাণ এতটা আশঙ্কা করা হচ্ছিল। সুতরাং, এখন সংক্রমণ শুরু হওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ আরো কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে এটা নিশ্চিত। তবে এক্ষেত্রে ক্ষীণ আশার আলো দেখাবে বাংলাদেশের কৃষি। কৃষি প্রধান দেশ হওয়ায় ভঙ্গুর অর্থনীতি কোনো রকমে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। কৃষি এদেশের অর্থনীতিকে কতটা সাপোর্ট দিবে তা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সকলেই অনুমান করতে পেরেছেন। কৃষিজ উৎপাদন ব্যাহত হলে দেখা দিবে খাদ্যাভাব। সর্বোপরি দেখা দিতে পারে দুর্ভিক্ষ।
যদি তাই হয়, পকেটে হাজার হাজার টাকা থাকলেও মিলবে না একমুঠো খাবার। ফলে করোনায় মৃত্যুর চেয়ে বেশি মৃত্যু হবে খাদ্যের অভাবে। কিন্তু খাদ্য সংকটে যেন পড়তে না হয় তার জন্য সরকারপ্রধান বারবার সকলকে সচেতন করছেন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একখ- জমিও ফেলে না রাখার জন্য তাগিদ দিচ্ছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত কীটনাশক সরবরাহে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় ফলন নেমে আসবে অনেকটা। তবুও এই সংকটকালীন মুহূর্তে যতটুকুই অবদান রাখবে তা দেশের পাঁচতলা থেকে গাছতলা অবধি সকল মানুষের মুখে হাসি ধরে না রাখতে পারলেও অন্তত ক্ষণিকের জন্য হাসি ফোটাতে পারবে বলে আশা করা যায়।