বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬, ১১:৪২ পূর্বাহ্ন
অনুসন্ধান ২৪ >> নামাজ হলো মুমিনের আত্মার প্রশান্তি, হৃদয়ের শান্তি এবং আল্লাহর দরবারে সবচেয়ে মহিমান্বিত সেতুবন্ধন। কিন্তু ইসলামে নামাজ কেবল ব্যক্তিগত এবাদতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো সমাজকে জাগ্রত করার, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে গাঁথার এবং ঐক্যের পতাকা উড়ানোর মাধ্যম।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর বাণীতে এশা ও ফজরের জামাতকে মুমিনের চিহ্ন এবং মুনাফিকের পরীক্ষা বলে আখ্যায়িত করেছেন। কেননা এই দুই সময়ে দুনিয়ার মোহ ও ঘুমের আকর্ষণ প্রবল থাকে। যে মুমিন আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে সেই সময়েও জামাতে হাজির হয়, সে-ই আসলে ঈমানের সৌন্দর্যে দীপ্ত।
যখন মসজিদের মিনার থেকে আজানের সুর ভেসে আসে, তখন আসলে এককভাবে কোনো ব্যক্তিকে ডাকা হয় না। বরং সামষ্টিকভাবে পুরো সমাজকে ডাকা হয়।
তাই জামাতে নামাজ মুসলিম উম্মাহর সম্মিলিত জীবনের প্রতীক।
অপরদিকে জামাত ত্যাগকারীদের প্রতি এসেছে কঠোর সতর্কবাণী, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে—জামাতের সহিত নামাজ আদায় শুধু নামাজ নয়, বরং ঈমান-অমানতের বড় একটি পরীক্ষাও বটে।
আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) বলেছেন—মুনাফিকদের নিকট সর্বাধিক কঠিন ও ভারী নামাজ হচ্ছে এশা ও ফজরের নামাজ। তাতে কি কল্যাণ ও সওয়াব নিহিত আছে, যদি তারা সে সম্পর্কে জানত, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তারা তাতে অংশগ্রহণ করতো। কখনো কখনো আমার ইচ্ছা জাগে যে আমি নামাজ আদায়ের নির্দেশ প্রদান করি, এবং তা কায়েম করা হয়, অত:পর এক ব্যক্তিকে আদেশ প্রদান করি, সে মানুষকে নিয়ে নামাজ আদায় করবে ; আমি একদল লোক নিয়ে বের হবো, যাদের সাথে থাকবে লাকড়ির বোঝা।
আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একবার রাসূল (সা.)-এর নিকট অন্ধ সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাকতুম উপস্থিত হয়ে বলল- হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আমাকে মসজিদে উপস্থিত করার মতো কেউ নেই—এই বলে সে নবীজির নিকট ঘরে নামাজ আদায়ের অনুমতি প্রার্থনা করল। রাসুল (সা.) তাকে অনুমতি দিলেন। সে বের হয়ে পড়লে তিনি তাকে ডেকে বললেন, তুমি কি আজান শুনতে পাও? সে উত্তর দিল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তবে তুমি আজানের ডাকে সাড়া প্রদান করো।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০৪৪)
আমরা খুঁজে বের করব এমন লোকদের, যারা নামাজে উপস্থিত হয়নি। আমরা তাদেরসহ তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেব।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৫৭)
এই হাদিসটিই এ কথা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট যে, ফরজ নামাজ মসজিদে আদায় আবশ্যক। কারণ রাসূল (সা.) উক্ত হাদিসে শরিয়ত সম্মত ওজর ব্যতীত জামাতে নামাজ ত্যাগকারীর জন্য আগুনের শাস্তির উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য যে সকল নির্দেশ ও কোরআন বা হাদিসের দলিল বিষয়টিকে আরো দৃঢ় করে, তা নিম্নে উল্লেখ করা হল।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন—আমাদের যুগে কেবল প্রকাশ্য মুনাফিক অথবা প্রবল অসুস্থ কেউই জামাত ত্যাগ করত। এমনকি রোগীও দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে মসজিদে আসত। (মুসলিম, হাদিস : ১০৪৫)
জামাতের ফজিলত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—জামাতে নামাজ পড়া একাকী নামাজের চেয়ে ২৫ গুণ বেশি সওয়াবের কারণ। মসজিদের পথে প্রতিটি পদক্ষেপে মর্যাদা বৃদ্ধি হয়, একটি পাপ মোচন হয় এবং ফেরেশতারা রহমতের দোয়া করতে থাকেন। (মুসলিম, হাদিস : ৬১১)
বিশেষ করে এশা ও ফজরের জামাতে রয়েছে অনন্য মর্যাদা। হাদিসে এসেছে—এশার জামাত অর্ধেক রাত এবাদতের সমান আর ফজরের জামাত পূর্ণ রাত এবাদতের সমান। (মুসলিম, হাদিস : ৬৫৬)
ফজর নামাজ জামাতে আদায়কারী আল্লাহর বিশেষ জিম্মায় থাকে। মহানবী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন—যে ব্যক্তি এই আমানতের প্রতি অবহেলা করবে, আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। (মুসলিম, হাদিস : ২৬১; তিরমিজি, হাদিস : ৩৯৪৬)
ফজরে উঠার করণীয়
আগে ঘুমানো ও নিয়মিত দোয়া করা।
দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি রাখা।
এলার্ম বা অন্যান্য উপায় অবলম্বন করা।
নামাজকে ভারী মনে করা, মনাফিকের চিহ্ন- এটা অন্তরে জাগ্রত রাখা
আল্লাহ বলেন—“নিশ্চয় মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে।” (সুরা নিসা, আয়াত : ১৪৫)
জামাতে নামাজ মুসলমানদের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহর নৈকট্যের অন্যতম মাধ্যম। শরয়ি ওজর ছাড়া ফরজ নামাজের জামাত ত্যাগ করা মারাত্মক, গুনাহ এবং মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য। তাই প্রতিটি মুসলিমের উচিত জামাতের মর্যাদা রক্ষা করা, বিশেষ করে এশা ও ফজরের জামাত সর্বদা উপস্থিত থাকা।
আল্লাহ আমাদের সকলকে জামাতের সহিত নামাজ আদায করার তাওফিক দান করুন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক