শুক্রবার, ২৪ Jul ২০২৬, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক :: করোনাকালে (এপ্রিল-নভেম্বর) নানা কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার প্রবাসী দেশে ফিরেছেন। তার মধ্যে ৪০ হাজার নারী কর্মী (গৃহকর্মী) ফিরেছেন। যাদের মধ্যে শুধু সৌদি আরব থেকেই ফিরেছেন ১৭ হাজার ৩ শ’ জন। এদের অধিকাংশই ফিরেছেন খালি হাতে। কিংবা বেতনের চেয়ে কম নিয়ে। অনেকে আবার নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরেছেন।
শনিবার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশন (বমসা)। বিশ্ব অভিবাসী দিবস উপলক্ষে বিদেশে নারী গৃহকর্মীদের নিয়ে কাজ করা বমসা এই সংবাদ সম্মেলনে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে যারা গৃহকর্মী হিসেবে গেছেন বা যাচ্ছেন বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন সংগঠনের পরিচালক অ্যাডভোকেট ফরিদা ইয়াসমিন। এসময় সংস্থাটির চেয়ারম্যান লিলি জাহান, সাধারণ সম্পাদক শেখ রোমানা ও প্রবাসী শ্রমিক ফেডারেশনের উপদেষ্টা আবুল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। এতে সৌদি আরব প্রবাসী (ছুটিতে আসা) খাদিজা এবং সৌদি আরব থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা কারিমা বেগম বক্তব্য রাখেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, করোনার কারণে যে ৩ লাখ ২৭ হাজার প্রবাসী দেশে ফিরেছেন তাদের বেশিরভাগই সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ফিরেছেন। কাজ না থাকা, চুক্তি বা আকামার মেয়াদ না বাড়ানো, অবৈধ হয়ে পড়া এবং অনেকেই কারাভোগ শেষে আউট পাস নিয়ে দেশে ফিরেছেন। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে করোনাকালে প্রবাসীদের দেশে ফেরার হার ৫ গুণেরও বেশি। দেশে ফিরে এসব রেমিট্যান্সযোদ্ধা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ফেরত আসা প্রবাসীদের ৭০ শতাংশই জীবিকা সঙ্কটে রয়েছেন। ৫৫ শতাংশ বলছেন তাদের উপর ঋণের বোঝা রয়েছে। ১৬টি বেসরকারি সংস্থার নেটওয়ার্ক বিসিএম-এর জরিপ মতে, করোনাকালে ৬১ শতাংশ পরিবারে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি। ৭৪ শতাংশ অভিবাসী (ফেরত আসা) কোনো টাকা পয়সা নিয়ে আসতে পারেননি। ২০১৩ সালের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইনে নারী অভিবাসী শ্রমিকের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি উল্লেখ করে ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, গন্তব্য দেশে নারী অভিবাসীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। মূল সমস্যা হলো, নারী শ্রমিক প্রেরণ প্রক্রিয়া। সচেতনতা এবং অজ্ঞতার কারণে দালাল বা প্রতারকের পাল্লায় পড়ে কিশোরী মেয়েরা অভিবাসনের নামে পাচার হয়ে যায় এবং কেউ কেউ লাশ হয়ে ফেরত আসে। মহামারির মধ্যেও নির্যাতন থেমে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বমসা’র হটলাইনে প্রতিদিন গড়ে ১৫-২০টি ফোন গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ পায়। যেমন- ফলপ্রসূ সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধানের অভাবে আমাদের নারী শ্রমিকেরা বিরতিহীনভাবে দীর্ঘ সময় কাজ করতে ও এক বাসার পরিবর্তে ২/৩ বাসায় কাজ করতে বাধ্য হয়। এক কাজের কথা বলে অন্য কাজ করতে বাধ্য করে। বেতন কম দেয়। সময়মতো বেতন দেয় না। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, অবসর-বিনোদনের কোনো সুযোগ না থাকা, দেশে যোগাযোগ করতে না দেয়া, বাথরুমে আটকে রাখা, শারীরিক, মানসিক এবং কখনো কখনো যৌন নির্যাতনের শিকার কিংবা নিখোঁজ বা হত্যার শিকার হওয়ার খবর আসে। বমসা’র সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৪ জন নারী অভিবাসীর লাশ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। এর মধ্যে ২২টি সৌদি আরব থেকে, ১৪টি লেবানন, ১১টি জর্ডান, ৭টি ওমান এবং ৪টি আরব আমিরাত থেকে এসেছে। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৪৭৩টি নারী অভিবাসীর লাশ এসেছে। এর মধ্যে এক সৌদি আরব থেকেই এসেচে ১৭৫টি। এর মধ্যে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার ১৪ বছরেরর কিশোরী উম্মে কুলসুম, কুমিল্লার ১৩ বছরের নদী আক্তারের লাশ এসেছে, যাদেরকে ২৫ বছরের যুবতি বানিয়ে সৌদি আরব পাঠানো হয়েছিল। ২৫ বছরের নিচে কাউকে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে পাঠানো যায় না। কিন্তু তাদের কীভাবে পাঠানো হলো এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বমসার পরিচালক বলেন, অনতিবিলম্বে নারী অভিবাসনের অন্তরায় সকল বাধা দূর করার জন্য ২০১৩ সালের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইনের সংশোধন করে নিরাপদ অভিবাসনের মাধ্যমে নারী অভিবাসী শ্রমিকের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিধান অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। বাধ্যতামূলকভাবে দেশে ফেরা প্রতিটি লাশের পোস্টমর্টেমের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ চিহ্নিত করা এবং এ ব্যাপারে দূতাবাসের পদক্ষেপ মনিটরিং ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। যেসকল ব্যক্তির দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের জবাবদিহিতা এবং শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে গন্তব্য দেশে যেসব মামলা দায়ের হয়েছে দূতাবাসের মাধ্যমে সেসব মামলার ফলোআপ ও মনিটরিং ব্যবস্থা করতে হবে। ২০১৮ সালের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড অ্যাক্টের ৯(খ) ধারা অনুযায়ী প্রত্যাগত নারীকর্মীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনর্বাসন ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আলাদা প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে নারী অভিবাসী ও তাদের পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে সরকারের কাছে দাবি জানায় বমসা। বমসা বলছে, সবচেয়ে বড় এবং ভয়ঙ্কর সমস্যা হলো, দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে স্পন্সরশীপ ব্যবস্থা বা প্রক্রিয়ায় কর্মীর সকল খরচ বহন করে নিয়োগকারী এবং চুক্তিপত্রে যথেষ্ট সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এদেরকে (গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া) কৃতদাসীর মতো ব্যবহার করা হয়।