সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:২৭ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ সংবাদ :
তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে যে বার্তা দিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ডেঙ্গুতে আরও ৫ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ৬৩৬ নতুন রোগী ট্রাভেল এজেন্সি নতুন অধ্যাদেশ আইন প্রত্যাহারের দাবি সচিবালয়ে আগুন লাগার বিষয়ে কী বলছে ফায়ার সার্ভিস খালেদা জিয়ার সবশেষ অবস্থা ও বিদেশ যাওয়া নিয়ে যা জানালেন রিজভী সোনিয়া-রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মামলা সীমান্তে পচছে ৩০ হাজার টন ভারতীয় পেঁয়াজ আদালত চত্বরে প্রকাশ্যে দুজনকে কুপিয়ে-গুলি করে হত্যা র‌্যাব পরিচয়ে ৩০ গরুসহ ট্রাক ডাকাতি ৫০ কোটি টাকা নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তা লাপাত্তা নিরাপত্তাকর্মীকে বেঁধে রেখে ডাকাতি ট্রাক চাপায় ৮ বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু দশম গ্রেডের দাবিতে কর্মবিরতি, দুর্ভোগে রোগীরা দাবি না মানলে ২ ডিসেম্বর থেকে কমপ্লিট শাটডাউন গাজায় ইসরাইলের ‘নির্যাতন-নিপীড়নে’ জাতিসংঘের উদ্বেগ
পর্তুগিজ এক জলদস্যু যেভাবে হয়েছিলেন সন্দ্বীপের রাজা

পর্তুগিজ এক জলদস্যু যেভাবে হয়েছিলেন সন্দ্বীপের রাজা

পর্তুগিজ এক জলদস্যু যেভাবে হয়েছিলেন সন্দ্বীপের রাজা
পর্তুগিজ এক জলদস্যু যেভাবে হয়েছিলেন সন্দ্বীপের রাজা

অনুসন্ধান২৪>>চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ। একসময় পর্তুগিজ ও আরাকানি জলদস্যুদের দুর্গ ছিল মেঘনা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপ। দ্বীপটি প্রায় এক দশক শাসন করেছেন সেবাস্তিয়ান গঞ্জালেজ তিবাউ নামের এক পর্তুগিজ জলদস্যু। সন্দ্বীপের ফিরিঙ্গি এই ‘রাজা’ ভারতে এসে প্রথমে সৈনিকের জীবন বেছে নেন। গোয়ায় একটি বাহিনীতে সৈনিকের কাজ নিয়েছিলেন তিনি। তবে তিনি খুব দ্রুত সৈনিকের পেশা ছাড়েন, বেছে নেন বণিকের জীবন।

চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ। একসময় পর্তুগিজ ও আরাকানি জলদস্যুদের দুর্গ ছিল মেঘনা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপ। দ্বীপটি প্রায় এক দশক শাসন করেছেন সেবাস্তিয়ান গঞ্জালেজ তিবাউ নামের এক পর্তুগিজ জলদস্যু। সন্দ্বীপের ফিরিঙ্গি এই ‘রাজা’র বিষয় নিয়ে জানা যাক।

জোয়াকিম জোসেফ এ ক্যাম্পোস-এর ‘হিস্ট্রি অব দ্য পর্তুগিজ ইন বেঙ্গল’ গ্রন্থে তিবাউর উত্থান নিয়ে একটি অধ্যায় আছে। সেখানে তিবাউর পরিচয় লেখা হয়েছে—তিবাউ অখ্যাত বংশোদ্ভূত এক পর্তুগিজ, যার জন্ম হয়েছিল ‘সান্তো আন্তোনিও দে তোজালে’। তিনি ১৬০৫ সালে ভারতবর্ষে এসেছেন। এরপর খুব দ্রুত বাংলায় চলে আসেন।

ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ভারতে এসে প্রথমে সৈনিকের জীবন বেছে নেন তিবাউ। গোয়ায় একটি বাহিনীতে সৈনিকের কাজ নিয়েছিলেন তিনি। তবে তিনি খুব দ্রুত সৈনিকের পেশা ছাড়েন, বেছে নেন বণিকের জীবন। একটি জাহাজ কিনে লবণের ব্যবসা শুরু করেন। এই লবণ ব্যবসার সূত্রে ১৬০৭ সালে ‘দেয়াং’ এলাকায় গিয়ে তাঁকে ভয়াবহ বিপদের মুখোমুখি হতে হয়, যা তাঁর পরবর্তী জীবনের গতিপথ পাল্টে দেয়।

এখানে উল্লেখ করা দরকার, দেয়াং এলাকাটি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত, তখন এটি আরাকানের অংশ ছিল। ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার লিখেছেন, তখন আরাকান রাজ্যে ফিরিঙ্গিদের দুটি প্রধান পল্লীর একটি ছিল ‘ডিয়াঙ্গা’ (দেয়াং)।

দেয়াং এলাকায় আরাকানরাজের নির্দেশে পর্তুগিজদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল ১৬০৭ সালে। সেই ঘটনায় বহু পর্তুগিজ প্রাণ হারালেও তিবাউ প্রাণে বেঁচে যান। তাঁর মতো বেঁচে যাওয়া আরও কিছু পর্তুগিজকে নিয়ে তিনি ‘গঙ্গার মুখে’ বসতি স্থাপন করেন এবং জীবিকা হিসেবে বেঁচে নেন জলদস্যুতার পথ। আরাকান রাজার ওপর প্রতিশোধের অংশ হিসেবে ওই রাজ্যের বিভিন্ন উপকূলে লুট করে তিবাউর দলটি তৎকালীন ‘বকলার’ (বরিশাল) বন্দরে নিয়ে যেতেন। বকলার ‘রাজা’ পর্তুগিজদের বন্ধু হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

দেয়াং এলাকায় আরাকানরাজের নির্দেশে পর্তুগিজদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল ১৬০৭ সালে। সেই ঘটনায় বহু পর্তুগিজ প্রাণ হারালেও তিবাউ প্রাণে বেঁচে যান। তাঁর মতো বেঁচে যাওয়া আরও কিছু পর্তুগিজকে নিয়ে তিনি ‘গঙ্গার মুখে’ বসতি স্থাপন করেন এবং জীবিকা হিসেবে বেঁচে নেন জলদস্যুতার পথ। আরাকান রাজার ওপর প্রতিশোধের অংশ হিসেবে ওই রাজ্যের বিভিন্ন উপকূলে লুট করে তিবাউর দলটি তৎকালীন ‘বকলার’ (বরিশাল) বন্দরে নিয়ে যেত। বকলার ‘রাজা’ পর্তুগিজদের বন্ধু হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

সেবাস্তিয়ান গঞ্জালেজ তিবাউ সন্দ্বীপ দখল করেন ১৬০৯ সালে। এর আগেও অবশ্য পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণ দ্বীপটিতে ছিল। পর্তুগিজ যোদ্ধা ‘ডমিঙ্গো কারভালহো’ এবং ‘ম্যানোয়েল দা মাত্তোস’ দ্বীপটি শাসন করেছেন। ১৬০৫ সালে কারভালহোর মৃত্যু হয়।

সতেরো শতকের ডাচ মানচিত্রকার জোহান ও কর্নেলিয়াস ব্লেউ-এর মানচিত্রে সন্দ্বীপকে Sundiva নামে চিহ্নিত করা হয়েছে

গবেষক ও ইতিহাসবিদ রিলা মুখার্জি লিখেছেন, ১৬০৭ সালে দেয়াংয়ে পর্তুগিজদের ওপর আরাকানরাজের নির্দেশে আক্রমণ হলে ম্যানোয়েল দা মাত্তোস পর্তুগিজদের সহায়তায় সন্দ্বীপ থেকে সেখানে যান। দেয়াংয়ের আক্রমণে মাত্তোস প্রাণ হারান। মাত্তোসের অনুপস্থিতিতে দ্বীপের দায়িত্ব ছিল পেরো গোমেজ নামের একজনের হাতে। গোমেজ ব্যর্থ প্রশাসক হওয়ায় তাঁর অদক্ষতার সুযোগে সন্দ্বীপে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই গোমেজের অধীনস্থ কর্মকর্তা ফতেহ খান দ্বীপটি দখলে নিয়ে নিজেকে শাসক ঘোষণা করেন।

ফতেহ খানের বাহিনীকে ১৬০৯ সালে পরাজিত করে সন্দ্বীপের দখল নেন তিবাউ। বেশ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে সেটি হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। প্রায় ৪০টি পালতোলা জাহাজ ও ৮০০ সৈন্য নিয়ে ফতেহ খান তিবাউর দলের ওপর আক্রমণ করেন। তবে নৌ চালনার দক্ষতায় সংখ্যায় কম হলেও জয়ী হয় তিবাউর দল। যুদ্ধে নিহত হন ফতেহ খান। তাঁর অনুসারীদের কেউ নিহত, কেউ বন্দী হন তিবাউর দলের হাতে।

তিবাউর সন্দ্বীপ অভিযানে সামরিক সহায়তা দিয়েছিলেন বকলার শাসক ‘রাজা’ প্রতাপাদিত্য। দ্বীপের রাজস্ব ভাগাভাগি করবেন এই শর্তে তিবাউকে ২০০ অশ্বারোহীর পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজও দেন তিনি। সন্দ্বীপ দখলের পর তিবাউর দল আরাকানি জাহাজগুলোতে হামলা চালিয়ে লুটপাট করতে শুরু করে। লুট করা মালামাল রাজা প্রতাপাদিত্যের বন্দরগুলোতে বিক্রি করা হতো। এরই ধারাবাহিকতায় ধনসম্পদের সঙ্গে সামরিক শক্তি বাড়তে থাকে তিবাউর।

তিবাউর সন্দ্বীপ অভিযানে সামরিক সহায়তা দিয়েছিলেন বকলার শাসক ‘রাজা’ প্রতাপাদিত্য। দ্বীপের রাজস্ব ভাগাভাগি করবেন, এই শর্তে তিবাউকে ২০০ অশ্বারোহীর পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজও দেন তিনি। সন্দ্বীপ দখলের পর তিবাউর দল আরাকানি জাহাজগুলোতে হামলা চালিয়ে লুটপাট করতে শুরু করে। লুট করা মালামাল রাজা প্রতাপাদিত্যের বন্দরগুলোতে বিক্রি করা হতো। এরই ধারাবাহিকতায় ধনসম্পদের সঙ্গে সামরিক শক্তি বাড়তে থাকে তিবাউর।

তিবাউ সন্দ্বীপের রাজস্বের অর্ধেক প্রতাপাদিত্যকে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে তা রাখেননি। বরং প্রতাপাদিত্যের দখলে থাকা দক্ষিণ শাহবাজপুর (ভোলা) দখলে নেন। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয় তাঁর। তিবাউর বাহিনীতে তখন এক হাজারের বেশি পর্তুগিজ, দুই হাজার স্থানীয় সৈন্য, ২০০ অশ্বারোহী। এর সঙ্গে বেড়েছে যুদ্ধজাহাজ, বাণিজ্যিক নৌকা ও সমরাস্ত্র, যা বেশ আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল তিবাউকে।

তিবাউ ছিলেন স্বাধীন রাজা। গোয়া থেকে পরিচালিত প্রাতিষ্ঠানিক পর্তুগিজ শাসন ‘এস্তাদো দা ইন্ডিয়ার’ অধীন ছিলেন না তিনি। গোয়ার নিয়ন্ত্রণহীন এ ধরনের অঞ্চলকে ইতিহাসবিদেরা পর্তুগিজদের ‘ছায়া সাম্রাজ্য’ কিংবা ‘অনানুষ্ঠানিক সাম্রাজ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

গোয়ার নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও বেশ কিছু সময় এস্তাদো দা ইন্ডিয়ার সহায়তা তিবাউ চেয়েছেন। ১৬১৫ সালের দিকে গোয়ার একটি সরকারি বহরের সঙ্গে লেম্রো নদী বেয়ে আরাকানের রাজধানী ‘ম্রাউক ইউ’ আক্রমণ করে তিবাউর দল। এ সময় নদীতে নোঙর করা আরাকানের ও বিদেশি বেশ কিছু জাহাজ ধ্বংস করে দলটি। তবে ডাচদের সহায়তায় তাদের বাহিনীকে পরাজয় বরণ করতে হয়।

১৬১৭ সাল পর্যন্ত সন্দ্বীপের তিবাউর শাসন অব্যাহত ছিল। ১৬১৭ সালে আরাকানরাজ মিন রাজাগির ছেলে ও উত্তরসূরি মিন খামাউং তাঁকে পরাজিত করেন।

সপ্তদশ শতকের এই সময়টাতে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও কৌশলগত কারণে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল সন্দ্বীপ। সন্দ্বীপ তখন লবণ উৎপাদনের জন্য বেশ খ্যাত। এই দ্বীপে উৎপাদিত লবণ বাইরের অঞ্চলগুলোতে রপ্তানি হতো। চাল, শস্য উৎপাদনের পাশাপাশি সুতির কাপড় উৎপাদনের জন্যও পরিচিত ছিল দ্বীপটি। এ ছাড়া এই সন্দ্বীপে নৌযান মেরামত কেন্দ্রও ছিল।

আরো পড়ুন

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © অনুসন্ধান24 -২০১৯