মঙ্গলবার, ২৮ Jul ২০২৬, ১১:৩১ পূর্বাহ্ন
আনোয়ার হোসেন :: আর মাত্র ৮ দিন পরই আসছে নতুন বছর। সবাই বছরটাকে নানান খুশিতে উদযাপন করলেও যারা শহর এলাকায় ভাড়াবাসায় থাকেন তাদের কাছে এ আনন্দটা যেনো ফিকে হওয়ার মতো।
প্রত্যেক বছর জানুয়ারি মাস এলেই কোনো কারণ ছাড়াই বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দেয় বাড়ির মালিকরা। অসহায় ভাড়াটিয়ারা সবকিছু সহ্য করে তা মেনে নিতে বাধ্য হন। বিশেষ করে পৌরসভার এলাকার তুলনায় সিটি শহরে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির নৈরাজ্য বিরাজমান।
আবার বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের খসড়া নিয়ে চলছে টানা হেছড়া। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯ সংশোধন করে ভোক্তা অধিকার আইন-২০১৮ নামে একটি খসড়া তৈরি করে অধিদপ্তর। এ খসড়াটি এখন পড়ে আছে মন্ত্রিপরিষদের হিমঘরে। বেশির ভাগ শহর এলাকায় চাকরির কারণে এবং সন্তানের লেখাপড়ার সুবিধার্থে বাধ্য হয়ে বছরের পর বছর থাকছেন ভাড়া বাসায়।
আর এ সুযোগে বাড়ির মালিকরা হাতিয়ে নিচ্ছেন বাড়তি সুবিধা। বছর ঘুরলেই বাড়িভাড়া বৃদ্ধির পাঁয়তারা করেন বাড়ির মালিকরা। কখনো কখনো বছরের মাঝামাঝিতেও বাড়িভাড়া বাড়ে বলে অনেকের অভিযোগ। বিশেষ করে বরিশাল সিটি শহরের নামকরা স্কুল-কলেজের আশপাশের এলাকায় বাড়িভাড়া অনেক বেশি।
কলেজিয়েট স্কুলের পাশে কলেজ রোড এলাকার বাসিন্দা মো. মিরাজ হোসেন কাজ করেন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে। কর্মস্থল বানারীপাড়া হলেও শুধু দুই সন্তানের লেখাপড়ার কথা মাথায় রেখে তিনি কলেজ রোড এলাকায় থাকছেন প্রায় চার বছর। দুই রুমের ফ্ল্যাট ভাড়া হিসেবে প্রতি মাসে তাকে দিতে হয় ১২ হাজার টাকা। এছাড়াও বিদ্যুৎ বিল, ইউটিলিটি বিল, পানির বিল ও নগর পরিছন্নকর্মী বিল এবং সার্ভিস চার্জসহ আরও গুণতে হয় আড়াই হাজার টাকা। সর্বমোট সাড়ে ১৪ হাজার টাকা লাগে শুধু বাসস্থানের জন্য।
তিনি অনুসন্ধান ২৪ ফোরের প্রতিবেদককে বলেন, গত চার বছরে চার বারই ভাড়া বাড়িয়েছেন বাড়ির মালিক। প্রতিবারই পাচশত থেকে এক হাজার টাকা করে বাড়িয়েছেন। আসছে নতুন বছরে আবারো ভাড়া বাড়ানোর কথা বলেছেন। তার সাথে পানির বিল দেড়শত টাকা নগর পরিছন্নকর্মীর বিল ৫০ টাকা বিদ্যুৎ বিল, ইউটিলিটি বিল বৃদ্ধি করবে মিরাজ হোসেন আরও বলেন, বাড়ির মালিক বলছেন যদি তার কাছে এগুলো বেশি মনে হয় তাহলে বাসা ছেড়ে দিতে পারেন। কিন্তু আস্তে আস্তে করে সংসার বড় হয়েছে, সন্তানদের লেখাপড়ার কথা চিন্তা করে তিনি বাধ্য হয়ে থাকছেন এই বাসাতেই।
তিনি প্রশ্ন করে বলেন, সরকারের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে আইন আছে শুনেছি তবে আদৌ কি এর বাস্তবায়ন আছে বলে প্রশ্ন রাখেন তিনি?
একধীকে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং বর্তমানে দ্রব্যমূল্যে ভাড়তি । নগরীর বি এম কলেজ রোড, নতুন বাজার, কলেজ রোড, বৌদ্দ পাড়া, হাসপাতাল রোড, নতুল্লাবাদ, কাশিপুর, সি এন বি রোড, আমতলার মোড়, সাগরদী, রুপাতলি, ধান গবেশনার, বাংলা বাজার, সদর রোড, পলাশপুর, আমানতগঞ্জ, কাউনিয়া, বিসিক রোড, ফাস লাইন, মল্লিক রোড, হাতেম আলি কলেজ, নিউ সার্কুলার রোডসহ বিভিন্ন এলাকার বাড়িভাড়া বেড়েই চলছে।
মল্লিক রোড এলাকার হানিফ হোসেন। ভাড়াবাসায় উঠেন ২০১২ সালে। তিনি আট বছর আগে মল্লিক রোড বাসায় ভাড়া দিয়েছেন সাড়ে চাঁর হাজার টাকা। বর্তমানে ওই একই বাসায় তিনি ভাড়া দেন ১১ হাজার টাকা।
হানিফ হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রায় প্রতি বছরই পাঁচশত টাকা করে ভাড়া বাড়তো। আবার কোনো বছর এক হাজার টাকাও বেড়েছে বলে জানান তিনি। ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা ও সংসারের ঝামেলার কারণে একই জায়গায় থাকতে হয়। নতুন বছর বাড়িভাড়া ও পানির বিল নগর পরিছন্নকর্মীর বিল বাড়ানোর বিষয়ে ইতোমধ্যে খবর পেয়েছেন বলে জানান হানিফ।
তিনি বলেন, দৈনিক দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ার সাথে সাথে বাড়িভাড়াও বাড়ছে। সংসার খরচ, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ, এর সঙ্গে বাড়িভাড়ার পানির বিল দেড়শত টাকা নগর পরিছন্নকর্মীর বিল ৫০ টাকা বিদ্যুৎ বিল, ইউটিলিটি বিল বাড়তি খরচ মিলিয়ে বরিশালে শহরে বসবাস করা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। হানিফ বলেন, বাড়িভাড়ার আইনটা যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ হতো তাহলে আমাদের সমস্যা হতো না।
বাড়িভাড়ায় নৈরাজ্যের কারণ হিসেবে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, সবাই শহরমুখী হওয়ার কারণে বরিশালে বাড়ির চাহিদা বেশি। বিশেষ করে চাকরি, পড়াশোনাসহ বিভিন্ন কারণে মানুষ সবচেয়ে বেশি আসে শহরে। ফলে বাড়িভাড়ার নোটিস দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িভাড়া হয়ে যাচ্ছে। এতে করে বাড়ির মালিকদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে তেমন কোনো দর কষাকষি করা যায় না।
বরিশাল ১০ বছরে নগরীতে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ২০০ শতাংশ। অথচ একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে মাত্র ১০০ শতাংশ। অর্থাৎ নিত্যপণ্যের দামের তুলনায় বাড়িভাড়া বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ। বরিশালে ২০০০ সালে পাকা ভবনে দুই কক্ষের একটি বাসার ভাড়া ছিল দেড় হাজার ৫০০ টাকা। বাড়িভাড়া বাড়ার আরও একটি কারণ হচ্ছে- লোকজন নানা কারণে শহরমুখী।
বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ-সম্পর্কিত অধ্যাদেশটি প্রথম জারি করা হয় ১৯৬৩ সালে। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ কার্যকর করতে ২০১০ সালে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিল। আইনটি বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। আদালতের মাধ্যমে ভাড়াসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির কথা আইনে বলা আছে। এইচআরপিবির রিট আবেদনটির পরিপ্রেক্ষিতে রুল ও চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১ জুলাই আদালত রায় দেন।
রায়ে বলা হয়, বিদ্যমান আইনটি কার্যকর না হওয়ায় ভাড়াটেকে সুরক্ষা দেওয়া যাচ্ছে না। আইনটি কার্যকরে