শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:৩১ পূর্বাহ্ন
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক এ সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়।বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বাংলা একাডেমি বইমেলা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তারেক রহমান এসব কথা বলেন।
বই পড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, জার্মান দার্শনিক ‘মারকুইস সিসেরো’র একটি উক্তি এখানে আমি খুবই প্রাসঙ্গিক মনে করছি। তিনি বলছিলেন, ‘বই ছাড়া ঘর আত্মা ছাড়া দেহের মতো’। বিজ্ঞানী এবং গবেষকরা বলছেন, বই শুধুমাত্র বিদ্যা শিক্ষা কিংবা অবসরের সঙ্গীয় নয় বরং বই পড়া মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের ব্যায়াম। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করে যেটি মানুষের স্মৃতিশক্তি এবং বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়ায়। এমনকি আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ার মতো রোগেরও ঝুঁকি কমায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই বইমেলার আয়োজন করা হয়। তবে আমাদের বইমেলা অন্য দেশের বইমেলার মতো নয়। আমাদের বইমেলা আমাদের মাতৃভাষার ভাষার অধিকার আদায় এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবে চিহ্নিত।
তবে প্রতি বছর মেলার আকার আয়তন বাড়লেও সেই হারে গবেষণাধর্মী বই প্রকাশিত হচ্ছে কিনা কিংবা মানুষের বই পড়ার অভ্যাস বাড়ছে কিনা এই বিষয়গুলো নিয়েও বর্তমানে চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে।
তবে বর্তমান সময়ে তথ্য প্রযুক্তি মানুষের বই পড়ার অভ্যাসে প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইন্টারনেট আসক্তি তরুণ প্রজন্মকে বই বিমুখ করে তুলছে। ইন্টারনেটেও অবশ্যই বই পড়া যায়ৃতবে গবেষকরা বলছেন, বইয়ের পাতায় কালো অক্ষরে লেখা বই পড়ার মধ্যে যেভাবে জ্ঞানের গভীরতা উপভোগ করা যায়, একইভাবে দিনের পর দিন কম্পিউটারের মনিটরে ডুবে থেকে জ্ঞানার্জন সম্ভব হলেও শরীর এবং মনোজগতে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রভাবও কম নয়।
যুক্তরাজ্য কিংবা কানাডার মতো অনেক উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরায় বলছেন, ইন্টারনেট ব্যবহারের আসক্তি পড়াশোনার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে জন জীবনে ইন্টারনেট অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠলেও এর নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কেও আমাদের সচেতন থাকতে হবে। বিশেষ করে বইয়ের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ বাড়াতে হবে।
অমর একুশে বইমেলা কেবল বই বেচাকেনার মেলা নয় বরং মেলা হয়ে উঠুক শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের সূতিকাগার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অমর একুশে বইমেলা শুধুমাত্র নিছক একটি উৎসবই হবে না বরং এই মেলা আমাদের আরও বইপ্রেমী করে তুলবে, নিয়মিত বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলবে, আজকের এই বই মেলায় দাঁড়িয়ে এটিই আমার প্রত্যাশা।
তারেক রহমান বলেন, বিশ্বের ১০২টি দেশের নাগরিকদের পাঠাভ্যাস নিয়ে একটি জরিপ প্রকাশিত হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন জরিপের ফলাফল বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা বই পড়ার শীর্ষে রয়েছেন। তালিকার সর্বনিম্নে রয়েছে আফগানিস্তান। বইপ্রেমীদের এই তালিকায় ১০২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। বাংলাদেশের একজন মানুষ গড়ে বছরে তিনটির মতো বই পড়েন। আর বই পড়ার পেছনে বছরে ব্যয় করেন মাত্র ৬২ ঘণ্টা সময়।
মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে আমরা সগৌরবে প্রতি বছর অমর একুশে পালন করি। দিবসটি এখন আর শুধু বাংলাদেশের নয়। অমর একুশে এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে। ৫২ সালের ভাষা শহীদদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আজকের এই বাংলা একাডেমি। বাংলা একাডেমির সৃজনশীল কার্যক্রমের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘অমর একুশে বইমেলা’। তবে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বছরগুলোতে অমর একুশে বইমেলা, অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা হিসেবে আয়োজন করার সুযোগ রয়েছে কিনা, সেটি আপনারা বিবেচনা করতে পারেন।
অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হলে বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বহু ভাষা এবং সংস্কৃতি শেখা-জানা এবং বোঝার দিকে আমাদের নাগরিকদের আগ্রহী করে তুলতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।
তিনি বলেন, আমি মনে করি বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজের এই সময়ে মাতৃভাষা ছাড়াও আরো একাধিক ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়া জরুরি। বর্তমানের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সমৃদ্ধি এবং সম্মানের সঙ্গেটিকে থাকতে হলে জ্ঞান এবং মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সমাজ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। এ জন্য আমাদের জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-প্রযুক্তিতে মেধায় নিজেদের সমৃদ্ধ হতে হবে। একইসঙ্গে বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
এইসব উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের সামনে তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করে দেয়। এভাবেই বইমেলা হয়ে উঠুক আমাদের সবার মিলনমেলা, প্রাণের মেলা।
বইমেলা শুধু একটি নির্দিষ্ট মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সীমাবদ্ধ না রেখে সারাবছর দেশের সব বিভাগ, জেলা, উপজেলায়ও আয়োজিত হতে পারে। এ ব্যাপারে বই প্রকাশকগণও উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে পারেন বলে আমি মনে করি। এ ব্যাপারে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় আপনাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি আমাদের তরুণ-তরুণীদের মেধা ও মনন বিকাশের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এরমধ্যে বিভিন্ন মেয়াদি গবেষণাবৃত্তি, তরুণ লেখক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরপ্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও দেশজ সংস্কৃতির মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হবে।