সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৪ পূর্বাহ্ন
মোঃ আনোয়ার হোসেন .. বরিশাল নগরীর প্রাণ হিসেবে পরিচিত ‘জেল খাল’ এখন অস্তিত্ব সংকটে। খালের পাড় ঘেঁষে সরকারি জমিতে একের পর এক গড়ে উঠছে অবৈধ বহুতলা ভবন। নথুল্লাবাদ থেকে শুরু করে শ্মশান ঘাটের ব্রিজ, নাজিরের পুল হয়ে কীর্তনখোলা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এই খালের দুই পাশে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই চলছে নির্মাণযজ্ঞ। অভিযোগ উঠেছে, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের (বিসিসি) একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে সরকারি জমিতেও এসব ভবনের প্ল্যান পাস করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নগরীর পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম জেল খালের সীমানা নির্ধারণ না করেই প্রভাবশালীরা খালের জমি দখল করে নিচ্ছেন। আইন অনুযায়ী খাল থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ভবন নির্মাণের বিধান থাকলেও বিসিসির সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা ‘গোপন লেনদেনের’ বিনিময়ে সরকারি জমিতেই বহুতলা ভবনের নকশা অনুমোদন দিচ্ছেন। অফিস সূত্রে জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রে খালের ৪০ ফুটের মধ্যে ভবন নির্মাণ নিষিদ্ধ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।
খাল পাড়ের হালিমা ভবনের মালিক আবদুল্লাহ বলেন, আমরা ২০১৩ সালে জমি ক্রয় করি ভবন নির্মাণ করেছি এবং ওই সালেই প্ল্যান পাস করিয়ে ৪র্থ তলা ভবন নির্মাণ করিছি। কোন দিনই আমরা জানতাম না এই জমির মালিক সরকার। তিনি বলেন, যদি জমি সরকারি হয় তাহলে আমাদের দলিল হলো কিভাবে এবং ভবন নির্মাণের প্ল্যান পাস কি দেখ দিলো।
রাব্বি ভিলার মালিক নাম প্রকাশ না করে তিনি জানান, ২০০৮ সালে জমি ক্রয় করে ভবন নির্মাণ করেছি কেউ কোন দিন বলেনি এই জমি সরকারের। তিনি আরও বলেন, যদি জমির মালিক সরকার হয় তাহলে দলিল হলো কি করে এবং ভবন নির্মাণের প্ল্যান পাস দিয়েছে কি ম্যাপ না দেখে।
নুর হ্যাপি ভবনের মালিক মো: নুরু আলম হক জানান, আমাদের পৈত্রিক জমি আমরা সেখানেই ভবন নির্মাণ করেছি, আপনি দেখেন আর এস, সিএস, বি এস সবই আমাদের নামে রেকর্ড সেখানে সরকারি জমি হয় কিভাবে। আর যদি সরকারি জমিতে ভবনই করে থাকি তাহলে প্ল্যান দিলো কিভাবে।
নতুন নির্মাণাধীন ভবনের মালিক বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের হিসাব রক্ষক আবুল বাসার জানান, খাল পাড়ের জমি আমি ক্রয় করেছি এবং ৪র্থ তলা ভবন নির্মাণের কাজ চলমান এখানে তো সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বরত কর্মকর্তা সাজ্জাদ সাহেব আসছে সে তো কিছুই বলেননি।
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির এই অভিযোগ নতুন নয়। সম্প্রতি সাবেক মেয়র ও প্রধান উচ্ছেদ কর্মকর্তাসহ ১৯ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দৈনিক বরিশাল সময় এর তথ্যমতে, দুদক ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত নথি ও অভিযোগ সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র তলব করেছে।
নথুল্লাবাদ থেকে কীর্তনখোলা পর্যন্ত খালের পাড় ঘুরে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় খালের ভেতরে আরসিসি পিলার গেঁথে ভবন তোলা হয়েছে। নাজিরের পুল ও মরগখোলা এলাকায় খালের প্রশস্ততা কমে এখন নালায় পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন যেখানে সাধারণ নাগরিকদের একটি প্ল্যান পাস করাতে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়, সেখানে খালের ওপর বহুতলা ভবনের অনুমোদন কীভাবে সম্ভব?
মাঝেমধ্যে জেলা প্রশাসন ও বিসিসি লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালালেও স্থায়ী কোনো সমাধান আসছে না। উচ্ছেদের নোটিশ দিলেও প্রভাবশালী ভবন মালিকরা তা উপেক্ষা করে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যান। খোদ বিসিসির কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এসব ভবন টিকে থাকছে বলে নগরবাসীর দাবি।
সিটি কর্পোরেশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নগরীর খালগুলো উদ্ধারে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন ভবনের নকশা অনুমোদন বন্ধ থাকলেও প্রভাবশালীরা পেছনের দরজা দিয়ে কাজ হাসিল করে নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।
জেল খাল বাঁচাতে দ্রুত বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং অবৈধভাবে দেওয়া প্ল্যানগুলো বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বরিশালের সচেতন নাগরিক সমাজ।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোঃ রেজাউল বারী খাল দখল করে ভবন নির্মাণ ও অবৈধ প্ল্যান পাসের বিষয়ে বলেন, ওই খাল পাড়ের কোন প্ল্যান পাস হয়নি। যদি কেউ নিয়ে থাকে এবং সরকারি কোন কর্মকর্তা সহযোগীতা করে থাকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে বরিশাল জেলা প্রশাসকের সাথে যোগাযোগ করার জন্য সরকারি মোবাইল নাম্বারে একাধিক বার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
বরিশালের জেল খাল দখল করে ভবন নির্মাণ এবং সরকারি জমিতে অবৈধভাবে নকশা (প্ল্যান) অনুমোদনের বিষয়ে এবং যারা খালের পাড় দখল করে ভবন নির্মাণ করছেন, তাদের এই কাজকে ‘বোকামি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার খাল খনন ও পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত তৎপর। ফলে অবৈধভাবে সরকারি জমি দখলকারীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।সরকারি জমিতে ভবন নির্মাণের নকশা পাসের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট জানান, যদি কেউ নিয়ম অমান্য করে নকশা অনুমোদন করিয়ে থাকে, তবে সেটি সম্পূর্ণ অন্যায়।যারা নিয়ম বহির্ভূতভাবে এই নকশাগুলো পাস করেছেন বা এ কাজে সহায়তা করেছেন, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।