বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬, ১১:৫৩ পূর্বাহ্ন
ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শন আর বাগাড়ম্বর যতই বাড়ছে, ততই এর দুর্বলতা ও ঝুঁকির বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে শুরু করেছেন বিশ্লেষকরা।
গতকাল মঙ্গলবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রতিষ্ঠানটির চীনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক অ্যামি হকিন্সের লেখা একটি নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই অযাচিত আস্ফালন বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে অন্যতম চীনকে বিশেষ সুবিধা দিতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
এতে বলা হয়, যুদ্ধে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে চীন আবারও তাদের খনিজ সম্পদের আধিপত্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের অগ্রাধিকারের তালিকায় তাইওয়ান ইস্যুটি ক্রমেই নিচের সারিতে নামছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা বিশৃঙ্খলার নতুন অধ্যায় চীনের জন্য শাপেবর হতে পারে বলে নিবন্ধে ধারণা প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ওয়াশিংটন এখন এমন এক পরিস্থিতিতে আটকা পড়েছে, যেখানে এশিয়া মহাদেশে মনোযোগ দেওয়ার মতো রাজনৈতিক বা সামরিক শক্তি তাদের অবশিষ্ট নেই।
চীন এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানে হামলার নিন্দা জানিয়ে একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়েছে। লক্ষ্যণীয় হলো, ট্রাম্পের খামখেয়ালি পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে বেইজিংয়ের এমন নরম প্রতিক্রিয়া নতুন কিছু নয়। এর আগে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যখন যুক্তরাষ্ট্র তুলে নিয়ে গিয়েছিল, তখনও চীন একই ধরনের অবস্থান নিয়েছিল। এর কারণ সম্ভবত, বেইজিং নিজেদের আন্তর্জাতিক আইনের রক্ষক হিসেবে জাহিরের এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। যদিও বিপদে পড়া মিত্র দেশগুলোকে তারা খুব একটা সহায়তা করছে না।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি চীনের জন্য কূটনৈতিক ফায়দা লোটার বাইরেও বড় একটি সুযোগ তৈরি করেছে। শুধু প্রতিরক্ষা খাতকে আরও শক্তিশালী করাই নয়, নিজেদের খনিজ সম্পদের আধিপত্য প্রদর্শনের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বেইজিংয়ের সামনে। যেহেতু তাইওয়ান ইস্যু এখন মার্কিন অগ্রাধিকার তালিকার পেছনে চলে গেছে, সেহেতু এই বিষয়টি নিয়েও চীন তাদের সুযোগ কাজে লাগাতে চায়।
অবশ্য এই সংঘাত চীনের জন্য কিছু ঝুঁকিও নিয়ে এসেছে, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে। কারণ ইরানের তেলের প্রায় ৮০ শতাংশের ক্রেতা চীন। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এই তেলের অনেকটা ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার লেবেল লাগিয়ে আমদানিকৃত হলেও এটি চীনের মোট তেল আমদানির ১৩ শতাংশ। ভেনেজুয়েলার তেল শিল্প মার্কিন নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর ইরানের সস্তা তেল হারানো চীনের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।
চীনের এই মুহূর্তে জ্বালানির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশিক্ষণের জন্য গড়ে তোলা ডেটাসেন্টারগুলোর জন্য প্রচুর বিদ্যুৎ প্রয়োজন। বিনিয়োগ ব্যাংক ‘ন্যাটিক্সিস’-এর মতে, বাজারের চেয়ে কম দামে তেল পাওয়ার সুযোগ চীনের জন্য ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। এ ছাড়া তেহরানে যদি পশ্চিমাপন্থি কোনো সরকার ক্ষমতায় আসে, তাহলে ইরানের সঙ্গে চীনের ৪০০ বিলিয়ন ডলারের কৌশলগত চুক্তিটিও ভেস্তে যেতে পারে।
তবে চীন বসে নেই। গত এক বছর ধরে তারা বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করেছে। রাইস্ট্যাড এনার্জির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর আমদানিকৃত বাড়তি তেলের ৮০ শতাংশই চীন মজুত করে রেখেছে। ফলে ইরানের সরবরাহ বন্ধ হলেও বা হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হলেও চীন অন্তত কয়েক মাস অনায়াসে চলতে পারবে।
ইরান সীমান্তে নতুন যুদ্ধ মার্কিন অস্ত্রভান্ডারেও টান ফেলেছে। পেন্টাগনের কাছে এখন প্রয়োজনীয় প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মাত্র ২৫ শতাংশ মজুত আছে বলে খবর রয়েছে। অথচ তারা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী থাড (ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও এফ-৩৫) যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলো তৈরিতে ব্যবহৃত হয় গ্যালিয়াম নামে একটি বিরল খনিজ, যার বিশ্ববাজার পুরোপুরি চীনের নিয়ন্ত্রণে।
গত বছর বাণিজ্য যুদ্ধের সময় চীন এই খনিজ রপ্তানি বন্ধ করে বিশ্ববাজারকে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছিল। এখন মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্প যখন চীনের এই কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল, তখন ট্রাম্পের এই যুদ্ধ বেইজিংয়ের হাতকেই শক্তিশালী করছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের জোসেফ ওয়েবস্টার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের মূল্যবান অস্ত্রশস্ত্র একটি গৌণ যুদ্ধক্ষেত্রে খরচ করছে দেখে বেইজিং বরং খুশিই হবে। এটি কেবল তাইওয়ান রক্ষার রসদই কমাবে না বরং নতুন অস্ত্র তৈরিতেও চীনের খনিজ আধিপত্য তাদের বাড়তি সুবিধা দেবে।