শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২:০৫ অপরাহ্ন
অনুসন্ধান ২৪ >>কুষ্টিয়া শহর মুক্ত করতে তুমুল লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের। এ লড়াইতে উভয় পক্ষেই হতাহতের সংখ্যা ছিল অনেক।
ঐতিহাসিক কুষ্টিয়া মুক্ত দিবস আজ (১১ ডিসেম্বর)। ১৯৭১ সালের এ দিনে কুষ্টিয়া জেলা হানাদার বাহিনী মুক্ত হয়েছিল। কুষ্টিয়া জেলার মুক্তি সেনারা রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে ছোট–বড় ২২টি যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে কুষ্টিয়াকে মুক্ত করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৯ মাসজুড়েই কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর তুমুল লড়াই হয়েছিল।
অনেক প্রাণের বিনিময়ে ১১ ডিসেম্বর আসে চূড়ান্ত বিজয়। একদিকে স্বজনের লাশ, অন্যদিকে সম্ভ্রম হারানো মা–বোনের আর্তনাদ, এতো বেদনা বয়েও সেদিন মানুষ বিজয়ের আনন্দে রাস্তায় নেমে উল্লাস করেছিল।
১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ ভোরে বাংলার দামাল ছেলেরা কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে পাকিস্তানি হানাদার ক্যাম্পে হামলা চালান। এ যুদ্ধে নিহত হয় অসংখ্য পাকিস্তানি সেনা। এরপর বংশীতলা, দুর্বাচারা, আড়পাড়া, মঠবাড়িয়া, মিরপুরের কাকিলাদহ, কুমারখালীর ঘাসখালিসহ ৪৪টি যুদ্ধ সংঘটিত হয় কুষ্টিয়া জেলায়।
হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষের গগণবিদারী ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে সেদিন কুষ্টিয়ার আকাশ–বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। পথে প্রান্তরে গড়ে তোলা হয়েছিল ব্যারিকেড। লাঠি–সড়কি, ঢাল–তলোয়ার নিয়ে উপজেলার হরিপুর–বারখাদা, জুগিয়া, আলামপুর, দহকোলা, জিয়ারুখী, কয়া, সুলতানপুর, পোড়াদহ, বাড়াদিসহ বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষ ছুটে এসেছিলেন কুষ্টিয়া শহরে। মুক্তির আনন্দে মাতোয়ারা হয়েছিলেন তারা।
পরবর্তীতে ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন হয়। এরপর থেকে দফায় দফায় বিমান হামলা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। তারা আবারো কুষ্টিয়া দখলে নিয়ে গণহত্যার উৎসবে মেতে ওঠে। তবে ৬ ডিসেম্বর তিন দিক থেকে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে বৃহত্তর কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকা হানাদারমুক্ত হতে থাকে। ৯ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া শহর ছাড়া অন্যান্য এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। তবে তুমুল যুদ্ধ চলে কুষ্টিয়ায়। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে ১১ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ার মাটি শত্রুমুক্ত করেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আব্দুল জলিল বলেন, শহরের তিন দিক থেকে ঘিরে নিয়ে আক্রমণ করে মুক্তিযোদ্ধারা। মূহুর্মূহু মর্টার চার্জ করলে পিছিয়ে কুষ্টিয়া জিলা স্কুল ও সার্কিট হাউজের ক্যাম্পে অবস্থান নেয় পাক বাহিনী। পরে টিকতে না পেরে রাতে ভেড়ামারার দিকে পালিয়ে যায় পাক হানাদাররা। ১১ ডিসেম্বর সকালে মিত্রবাহিনী বিমান থেকে বোমা ফেললে পাক হানাদারদের দোসররাও পালিয়ে যায়। মুক্ত কুষ্টিয়ায় প্রবেশ করে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা।
এদিকে রাজাকারদের সঙ্গে পরামর্শ করে ফাঁদ পেতে বসে থাকেন পাক হানাদাররা। কুষ্টিয়া শহরের কাছে চৌড়হাঁসে ব্রিজের নিচে মাইন পেতে রাখে তারা। ১০ ডিসেম্বর দুপুরে মিত্রবাহিনীর ৪টি ট্যাংক পার হওয়ার পরই ব্রিজটি উড়িয়ে দেয় তারা। এই ফাঁদে পড়ে মারা যায় মিত্রবাহিনীর অন্তত ২০০ জন। পরে হেলিকপ্টার এসে যুদ্ধে অংশ নেয়। এখানে মিত্রবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারও বিধ্বস্ত করে পাক বাহিনী। এরপর কিছুটা পিছু হটে শক্তি সঞ্চয় করে মূহুর্মূহু মর্টার চার্জ করতে থাকে মিত্রবাহিনী।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শামীম রেজা বলেন, ঐ সময় কুষ্টিয়া শহর ছিল শুনশান। এক ভয়ার্ত নগরী। যাওয়ার আগেও বিহারীরা ব্যাপক লুটপাট করে। তিনি বলেন, এর আগে একাত্তরের মার্চ মাসেই প্রতিরোধ যুদ্ধে কুষ্টিয়াকে মুক্ত করে ফেলেন মুক্তিকামীরা। সেসময় পরাজিত হয়ে নিহত হন অনেক পাক সেনা। কুষ্টিয়া শহর মুক্ত করতে তুমুল লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের। এ লড়াইতে উভয় পক্ষেই হতাহতের সংখ্যা ছিল অনেক। অনেক প্রাণের বিনিময়ে ১১ ডিসেম্বর আসে চূড়ান্ত বিজয়।