মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ১২:০০ অপরাহ্ন
আমেরিকাপ্রবাসী বিএনপি নেতা–কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের নিষ্ক্রিয় ভাব চলছে। টানা সাত বছর ধরে তাদের কোন সাংগঠনিক কমিটি নেই, নেতৃত্ব নেই। দলের সম্মেলন নিয়ে মাঝেমধ্যে কথা হলেও বাস্তবে কিছু হয় না। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকলেও এখানে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে কোন্দল রয়েছে। এসব নিয়ে নেতা–কর্মীরা হতাশায় ভুগছেন। অবশ্য বনভোজন করে, মাঝেমধ্যে দায়সারা কর্মসূচি পালন করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেন তারা। নেতা কে হবে—এ নিয়ে প্রতিযোগিতা আছে। তবে কেন্দ্র অনুমোদিত যেকোনো কমিটি বা নেতৃত্বকে মেনে নিতে রাজি আছেন বলে জানালেন নেতারা।
বিএনপির দলীয় নেতা-কর্মীদের একাধিক সূত্রে জানা যায়, দেশের মতো
আমেরিকায় কোন ধরপাকড় নেই, গ্রেপ্তারের ভয় নেই, রাজনৈতিক হুমকি নেই। তবু দীর্ঘ সময় সম্মেলন না হওয়ায় হতাশ অনেকে। রাগে–ক্ষোভে অনেকেই দল থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। আবার অনেকেই দলীয় কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে অনীহা প্রকাশ করেন। কেউ আবার একেবারেই নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে আছেন। নিউইয়র্কের কয়েকজন নেতা সাধারণ কর্মীদের আগলে রাখার চেষ্টা করলেও বেশ কিছু নেতা-কর্মী তাদের আহ্বানে সাড়া দিচ্ছেন না। হাতেগোনা দু-একটি ঘরোয়া সভায় সীমাবদ্ধ ও দায়সারা বক্তব্য দেওয়া ছাড়া তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায় না যুক্তরাষ্ট্র শাখা বিএনপির নেতা-কর্মীদের।
বিএনপির ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীও আলাদাভাবে পালন করতে দেখা গেছে। উপস্থিতিও ছিল খুবই কম। পার্কে খাবার–দাবার খেয়ে আনন্দপূর্তি করে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছেন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর খবর বলে। ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিকদের অনুরোধ করেছেন সংবাদটি ছাপানোর জন্য। পার্কে কেন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী—জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীরা বিষয়টি এড়িয়ে যান।
সর্বশেষ ২০০৪ সালে বিএনপির কমিটি গঠিত হয়েছিল। ১০১ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৩ সালে সেই কমিটি বিলুপ্তি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় কমিটি। তারপর থেকে এখনো সম্মেলন হয়নি। তখন বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন আবদুল লতিফ সম্রাট, সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন জিল্লুর রহমান (জিল্লু)। কমিটি গঠনের পর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম চাঙা হয়ে ওঠে। দল ক্ষমতায় থাকাকালে নেতা-কর্মীদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। দলীয় সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমেরিকা সফরের সময়ে নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছিলেন। এরপর ধীরে ধীরে দলীয় কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে উঠে।
একাধিকবার সম্মেলন দেওয়ার দাবি উঠলেও সম্মেলন হয়নি। ফলে নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে দলীয় কর্মসূচি পালন করে আসছে। মূলত এসব কর্মকাণ্ড ছিল লোক দেখানো। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সফরকালে প্রতিবারই বিএনপি জাতিসংঘের সদর দপ্তরের সামনে সম্মিলিতভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বসবে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণ দেবেন। কিন্তু এবার সেখানে বিএনপির জোরালো কোন কর্মসূচি না থাকার আভাস দিয়েছেন নেতা-কর্মীরা। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, দল করে কোন মূল্যায়ন পাই না। এখনো সম্মেলন হয়নি। হওয়ার সম্ভাবনাও নেই বলে মনে করেন সাধারণ নেতা-কর্মীরা।
সম্মেলন প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামাল পাশা (বাবুল) ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘দলকে গতিশীল করার জন্য সম্মেলন জরুরি। কেন্দ্রীয় কমিটি যাকেই যুক্তরাষ্ট্র শাখা বিএনপির দায়িত্ব দেবেন, তাকেই আমরা নেতা মেনে নেব।’
দীর্ঘ সময় ধরে সম্মেলন না হওয়ায় মান–অভিমান করে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বেলাল মাহমুদ দলীয় কার্যক্রমে এখন আর অংশ নেন না। তার মতো অনেক নেতা-কর্মী দল থেকে দুরে সরে গেছেন।
বিএনপির সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন ও গিয়াস আহমেদ বলেন, ‘আমরা সব কর্মসূচি পালন করছি। বেগম জিয়ার জন্য বেশ কিছু কর্মসূচি পালন করেছি।’
তবে সম্মেলন না হওয়ায় কিছু নেতা-কর্মী অভিমান করে কর্মসূচি থেকে বাইরে ছিলেন। সম্মেলন হলে তারা আবার দলে ফিরে আসবে বলে বিশ্বাস করেন এই দুই নেতা। দেলোয়ার আরও বলেন, সাবেক কমিটি থেকে তিন–চারজনকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নিয়ে গিয়ে সম্মেলন দিলে দলের ভেতর কোনো কোন্দল থাকবে না। তবে সম্মেলনে কারা কাউন্সিলর হবেন, তার জন্য বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
২০১৭ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র শাখা বিএনপির কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব পান সাবেক শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। তিনি দায়িত্ব পাওয়ার পর কিছু স্টেট বা অঙ্গরাজ্যে কমিটি গঠন করেন। কয়েকটি স্টেট কমিটি গঠনের সময় তাঁর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠে। সর্বশেষ নিউইয়র্ক স্টেটসহ বিএনপির মূল কমিটি গঠন করতে গেলে তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের তোপের মুখে পড়েন। একপর্যায়ে তিনি বাধ্য হয়ে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ান।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র শাখার সম্মেলন করার আরকোনো উদ্যোগ নেয়নি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। দীর্ঘ ৭ বছর সম্মেলন না হলেও দলকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে ও কর্মসূচি পালন করে আসছেন বিএনপি নেতা আবদুল লতিফ (সম্রাট), অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন, গিয়াস আহমেদ, ডা. মুজিবুর রহমান, জিল্লুর রহমান, কাজী শাখাওয়াত হোসেন (আযম), জসিম উদ্দিন, মোস্তফা কামাল পাশা বাবুল, শারফাত হোসেন (বাবু), মিল্টন ভূঁইয়া, সোলেমান ভূঁইয়া, ফিরোজ আহমেদ, গোলাম ফারুক (শাহিন), আকতার হোসেন (বাদল), জাহাঙ্গীর এম আলম, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, পারভেজ সাজ্জাদ, আবদুল বাতেন, রফিকুল ইসলাম (ডালিম), বাবুল আহমেদ, বেবী নাজনীন, আবদুস সবুর, মাওলানা আতিকুল্লাহ প্রমুখ।
কর্মসূচি পালন ও সম্মেলন সম্পর্কে বিএনপির সাবেক ৩নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী আযম বলেন, ‘বছরের পর বছর কমিটি ছাড়া দল চলতে পারে না, কেন্দ্রীয় নেতারা এখানে আসেন। আমরা তাদের যথাযথ সম্মান করি, দ্রুত সম্মেলন দিতে অনেকবার অনুরোধ জানিয়েছি। সম্মেলন না দেওয়ার কারণে দলে কোন্দল ও হতাশা বাড়ছে।’
সাবেক সভাপতি আবদুল লতিফ বলেন, ‘একটি দলকে সংঘবদ্ধভাবে পরিচালনা করতে হলে সম্মেলনের বিকল্প নেই। তাই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে আমাদের অনুরোধ, শিগগিরই সম্মেলন দেওয়া হোক। আমরা দায়িত্বপ্রাপ্ত যে কাউকেই মেনে নিতে রাজি। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র শাখা বিএনপির নেতা-কর্মীদের নজর এখন কেন্দ্রীয় কমিটির দিকে।’
জিল্লুর রহমান দাবি করেন, জাতীয়তাবাদী শক্তি পুরো যুক্তরাষ্ট্রে সক্রিয় রয়েছে। ডাক আসলেই আবার কর্মীদের উচ্ছ্বাস দেখা যাবে। দেশের চরম এই দুঃসময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসে বিএনপি নেতা–কর্মীরা নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন।